বৃহস্পতিবার, ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ৩০ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুতগতির দুইটি যাত্রীবাহী ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষ দেশটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অন্তত ২১ জনের প্রাণহানি এবং বহু মানুষের গুরুতর আহত হওয়ার এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি স্পেনের আধুনিক রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা, তদারকি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

দ্রুতগতির রেল, কিন্তু নিরাপত্তার ঝুঁকি

ইউরোপের অন্যতম উন্নত হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক রয়েছে স্পেনে। ‘এভিই’ নামে পরিচিত এই নেটওয়ার্ক দেশটির বড় শহরগুলোকে সংযুক্ত করেছে। তবে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, উচ্চ প্রযুক্তি ও দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সামান্য ত্রুটি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুতগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া মানেই সেখানে একাধিক সম্ভাব্য ঝুঁকি কাজ করেছে, যার মধ্যে থাকতে পারে সিগন্যালিং ব্যবস্থার ত্রুটি, ট্র্যাকের কারিগরি সমস্যা, যান্ত্রিক বিপর্যয় অথবা মানবিক ভুল।

আগেও ঘটেছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা

স্পেনে এটি প্রথম বড় ট্রেন দুর্ঘটনা নয়। ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলায় একটি দ্রুতগতির ট্রেন দুর্ঘটনায় ৭৯ জন নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর রেল নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, বড় দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাময়িকভাবে জোরদার হলেও দীর্ঘমেয়াদে তদারকির ঘাটতি আবারও ঝুঁকি তৈরি করে।

দুর্ঘটনার কারণ

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী ওসকার পুয়েন্তে দুর্ঘটনার কারণকে ‘অত্যন্ত অদ্ভুত’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই মন্তব্যই ইঙ্গিত দেয়, ঘটনাটি সাধারণ কোনো কারিগরি ত্রুটি নাও হতে পারে। দুই ট্রেনের একসঙ্গে লাইনচ্যুত হওয়া এবং একই স্থানে সংঘর্ষ, এমন পরিস্থিতি সাধারণত বহুমাত্রিক ব্যর্থতার ফল। রেল নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হলে অন্য ট্রেনের স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকার কথা। সেই ব্যবস্থাটি কেন কার্যকর হয়নি, এটাই এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন।

উদ্ধার অভিযানে প্রকাশ পেয়েছে ভয়াবহ বাস্তবতা

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীদের অভিজ্ঞতা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে। জীবিতদের কাছে পৌঁছাতে মৃতদের মরদেহ সরিয়ে পথ তৈরি করতে হয়েছে, এই তথ্য শুধু দুর্ঘটনার তীব্রতা নয়, বরং জরুরি সেবার ওপর চাপের বাস্তবতাও তুলে ধরে। প্রায় ৩০০ যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি যাত্রা করছিল, যা স্পষ্ট করে দেয়, এ ধরনের দুর্ঘটনা হলে হতাহতের সংখ্যা কত দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের ‘গভীর বেদনার রাত’ মন্তব্য দেশটির মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। আদমুজ শহরের মেয়র একে ‘দুঃস্বপ্ন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। দেশজুড়ে শোকের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভও প্রকাশ পাচ্ছে, বিশেষ করে রেল নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় তদারকি নিয়ে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, আধুনিক ইউরোপে এমন দুর্ঘটনা কেন বারবার ঘটছে?

ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা

এই দুর্ঘটনার পর স্পেন সরকার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল কারণ নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হলো রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামগ্রিক পুনর্মূল্যায়ন, স্বচ্ছ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং দায় নির্ধারণে কঠোরতা। এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রযুক্তির অগ্রগতি যতই হোক, নিরাপত্তায় সামান্য অবহেলা মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। স্পেনের রেলব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এখন এই তদন্তের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version