বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় আবারও ইউরোপের প্রভাব স্পষ্ট। চলতি বছরের হেনলি পাসপোর্ট সূচকে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করেছে ইউরোপীয় দেশ স্পেন, যা দেশটির বৈশ্বিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হেনলি পাসপোর্ট সূচক অনুযায়ী, স্পেনের পাসপোর্টধারীরা বর্তমানে ১৮৬টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়া বা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় ভ্রমণ করতে পারেন। এই অর্জনের মাধ্যমে ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে তৃতীয় স্থানে থাকা পাঁচটি দেশের মধ্যে একটি হলো স্পেন ।
হেনলি পাসপোর্ট সূচকের গুরুত্বপূর্ণ
হেনলি পাসপোর্ট সূচক বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য পাসপোর্ট র্যাংকিং। এটি তৈরি করা হয় ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)-এর তথ্যের ভিত্তিতে, যেখানে দেখা হয় একটি দেশের নাগরিকরা কতগুলো দেশে ভিসা ছাড়াই প্রবেশাধিকার পান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সূচক শুধু ভ্রমণ সুবিধার পরিমাপ নয়, বরং এটি একটি দেশের, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক শক্তি ও বৈশ্বিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হয়।
যে কারণে স্পেনের পাসপোর্ট শক্তিশালী
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের পাসপোর্ট শক্তিশালী হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। কারণগুলো হলো, স্পেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শেনজেন অঞ্চলের সদস্য হওয়ায় ইউরোপজুড়ে অবাধ চলাচলের সুবিধা পায়। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্পেনের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা ভিসামুক্ত চুক্তি বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তুলনামূলক শক্তিশালী অর্থনীতি স্পেনকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি আস্থাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এছাড়া, বিশ্বের শীর্ষ পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি হওয়ায় স্পেন আন্তর্জাতিক যাতায়াত ও কূটনৈতিক সহযোগিতাকে বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
ইউরোপের আধিপত্য ও এশিয়ার শীর্ষস্থান
চলতি র্যাংকিং ইউরোপীয় দেশগুলোর আধিপত্য চোখে পড়ার মতো। শীর্ষ ১০-এ ৩০টি ইউরোপীয় দেশ অবস্থান করছে। তবে এক নম্বর স্থান ধরে রেখেছে সিঙ্গাপুর, যেখানে পাসপোর্টধারীরা ১৯২টি দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার পান। দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া, যাদের ভিসামুক্ত গন্তব্য সংখ্যা ১৮৮টি।
বৈশ্বিক বৈষম্য
যেখানে স্পেনের মতো দেশগুলো ভিসামুক্ত বিশ্ব ভ্রমণের সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে অনেক দেশের নাগরিকদের চলাচল এখনো কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ। উদাহরণ হিসেবে, বেলারুশের পাসপোর্টধারীরা ভিসামুক্ত যেতে পারেন মাত্র ৭৯টি দেশে, কসোভোর নাগরিকরা ৮১টি দেশে, যা তাদের বিশ্ব র্যাংকিং ৫৯তম স্থানে রেখেছে। এই বৈষম্যকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মোবিলিটি ইনইকুয়ালিটি বা চলাচলের বৈশ্বিক অসমতা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের চেয়ারম্যান ড. ক্রিশ্চিয়ান এইচ. কেলিন মনে করেন, আজকের বিশ্বে পাসপোর্টের শক্তি কেবল ভ্রমণের বিষয় নয়। এটি সুযোগ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যদিও গড় ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার বাড়ছে, বাস্তবতা হলো এই সুবিধা মূলত ধনী ও রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশগুলোর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
স্পেনের অবস্থান যে বার্তা দিচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, হেনলি পাসপোর্ট সূচকে স্পেনের তৃতীয় স্থান শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি ইঙ্গিত দেয়, বৈশ্বিক কূটনীতিতে স্পেনের শক্ত অবস্থান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মিলিত শক্তি, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উন্নত রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান সুবিধা, একই সঙ্গে এটি উন্নয়নশীল ও সংঘাতপীড়িত দেশগুলোর জন্য একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জও তুলে ধরছে।
