যুক্তরাজ্যে ক্ষমতায় গেলে বিদেশি নাগরিকদের প্রায় সব ধরনের সরকারি ভাতা বন্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করতে যাচ্ছে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে। দলটির দাবি, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে কল্যাণ খাতে ৫ হাজার কোটি পাউন্ড ব্যয় কমানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে দলটি।
রিফর্ম ইউকের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের ইউনিভার্সাল ক্রেডিট, আবাসন ভাতা, বেকার ভাতা, করমুক্ত শিশু পরিচর্যা সুবিধা এবং চাইল্ড বেনিফিটসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এমনকি যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকরাও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তবে বিদেশি স্বামী বা স্ত্রী থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না। একইভাবে পর্যাপ্ত ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স অবদান থাকা বিদেশি পেনশনভোগীরা স্টেট পেনশন পাওয়ার সুযোগ ধরে রাখবেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য, বিশেষ করে গুর্খা ভেটেরানদের জন্যও ছাড় রাখার কথা জানিয়েছে দলটি।
রিফর্ম ইউকের দাবি, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদেশি নাগরিকদের জন্য ব্রিটিশ সরকার প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি পাউন্ড কল্যাণ ভাতা ব্যয় করেছে। বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ বিদেশি নাগরিক ইউনিভার্সাল ক্রেডিট পাচ্ছেন বলেও দাবি দলটির।
রিফর্ম ইউকের সম্ভাব্য অর্থমন্ত্রী রবার্ট জেনরিক বলেন, বিদেশি নাগরিকদের পেছনে ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থ ব্যয় করা ‘অনৈতিক’। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির কল্যাণ ব্যয় ৪০৭ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
দলটির হিসাব অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পঞ্চম বছরে বছরে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি পাউন্ড এবং অষ্টম বছরে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় হতে পারে।
বিদেশিদের ভাতা বন্ধের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন সুবিধাতেও বড় পরিবর্তন আনতে চায় রিফর্ম ইউকে। দলটির ৫০ পৃষ্ঠার নীতিপত্রে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের প্রতিবন্ধী ভাতা কমানো বা বন্ধ করে বছরে আরও ২ হাজার ২০০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
এর অংশ হিসেবে পার্সোনাল ইন্ডিপেন্ডেন্স পেমেন্ট (পিআইপি) এবং কর্মক্ষম বয়সী মানুষের জন্য ইউনিভার্সাল ক্রেডিট-এর স্বাস্থ্য সুবিধা বাতিল করে নতুন ‘হেলথ সিকিউরিটি অ্যালাওয়েন্স’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেবল গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই সরাসরি নগদ সহায়তা পাবেন। অন্যদের স্থানীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে কাজে অনুপস্থিত কর্মীদের দ্রুত কর্মস্থলে ফেরাতে নিয়োগকর্তাদের জন্য ‘রিটার্ন টু ওয়ার্ক কভার’ নামে একটি বিশেষ বীমা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে রিফর্ম ইউকের প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি। কনজারভেটিভদের অভিযোগ, দলটি তড়িঘড়ি করে একটি অসম্পূর্ণ পরিকল্পনা সামনে এনেছে। তাদের মতে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্রেক্সিট-সংক্রান্ত জটিল আলোচনায় আবারও ফিরতে হতে পারে।
লেবার পার্টিও বলেছে, পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের প্রত্যাহার চুক্তি পুনরায় আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে বসবাস, কাজ ও কর দিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ সরকারি সহায়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে রিফর্ম ইউকের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলার মধ্যেই এ প্রস্তাব সামনে এলো। কল্যাণ ভাতা নিয়ে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থানের কারণে এর আগে কনজারভেটিভদের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন দলটির নেতা নাইজেল ফারাজ। নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে কল্যাণ ব্যয় কমানো এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোরভাবে তুলে ধরতে চাইছে রিফর্ম ইউকে।
