তীব্র স্থানীয় প্রতিবাদ, রাজনৈতিক চাপ ও আইনি চ্যালেঞ্জের মধ্যেই যুক্তরাজ্যের ইস্ট সাসেক্সে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটিতে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রথম দলকে স্থানান্তর করেছে ব্রিটিশ সরকার। বৃহস্পতিবার ভোরে ক্রোবরো ট্রেনিং ক্যাম্পে ২৭ জন পুরুষ আশ্রয়প্রার্থীকে নিয়ে আসা হয় বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস)।
সরকার জানিয়েছে, এটি একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার অংশ। আগামী কয়েক মাসে ক্রোবরো ক্যাম্পে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ জনে নেওয়া হবে। যুক্তরাজ্য সরকার মোট দুটি পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ ৯০০ জন আশ্রয়প্রার্থী রাখা যাবে। একটি ইস্ট সাসেক্সের ক্রোবরোতে এবং অপরটি স্কটল্যান্ডের ইনভারনেসে।
ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এই সিদ্ধান্তকে সরকারের কঠোর অবস্থান ও আশ্রয় ব্যবস্থার সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার ফলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং স্থানীয় সেবাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তার ভাষায়, অবৈধ অভিবাসন সমাজের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে। অ্যাসাইলাম হোটেল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যাতে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রতি আগ্রহ কমে। ক্রোবরো কেবল শুরু। আমার লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি অ্যাসাইলাম হোটেল বন্ধ করে সেই জায়গাগুলো স্থানীয় কমিউনিটির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যে হোটেলে অবস্থানরত আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ১৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ২৭৩ জনে। পূর্ববর্তী সরকারের সময় প্রায় ৪০০টি হোটেল আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল, যার মধ্যে বর্তমানে ২০০টিরও কম হোটেল কার্যকর রয়েছে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ক্রোবরো শহর ও আশপাশের এলাকায় তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন এই স্থানান্তরের বিরোধিতা করে স্থানীয় কাউন্সিলে আপত্তি জানিয়েছে।
‘ক্রোবরো শিল্ড’ নামের একটি স্থানীয় আন্দোলনকারী সংগঠন ইতিমধ্যেই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সংগঠনটির দাবি, উইলডেন জেলা কাউন্সিলের এই পরিকল্পনা ঠেকানোর ক্ষমতা রয়েছে এবং সে জন্য আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে চাপ অব্যাহত রেখেছি। আমাদের মূল আপত্তি হলো জরুরি ক্ষমতার অপব্যবহার। কোনো স্বচ্ছতা বা যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই মানুষকে এখানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। প্রতিবাদকারীরা ইতিমধ্যে প্রায় এক লাখ পাউন্ড তহবিল সংগ্রহ করেছেন, যার উদ্দেশ্য এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া। প্রতি সপ্তাহান্তেই ক্রোবরোর রাস্তায় বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শহরের এত কাছাকাছি বড় আকারের আশ্রয়প্রার্থী আবাসন গড়ে তোলাই তাদের প্রধান উদ্বেগ।
বুধবার সন্ধ্যায় উইলডেন জেলা কাউন্সিল জানিয়েছে, অভিবাসনমন্ত্রী অ্যালেক্স নরিস তাদের এই স্থানান্তর পরিকল্পনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন। তবে কাউন্সিল বলেছে, হাইকোর্টে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ এখনো খোলা রয়েছে। কাউন্সিল নেতা জেমস পার্ট্রিজ বলেন, আমরা মন্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, এই সিদ্ধান্ত একেবারেই ঠিক নয়। কাউন্সিলের জোরালো আপত্তি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। আইনগতভাবে বাস্তবসম্মত মনে হলে আমরা আদালতে যাব।
সাসেক্স উইল্ড এলাকার কনজারভেটিভ এমপি নুস গনি সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার অভিযোগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো প্রমাণ করতে পারেনি যে এই ক্যাম্পটি নিরাপদ এবং সব নিয়মনীতি মেনে প্রস্তুত করা হয়েছে। একই সুরে কথা বলেছেন ক্রোবরো শিল্ডের অন্যতম নেত্রী কিম বেইলি। তিনি অভিযোগ করেন, ক্লাস কিউ’ নামে একটি বিশেষ উন্নয়ন বিধি ব্যবহার করে সামরিক ক্যাম্পটির ব্যবহার পরিবর্তন করা হয়েছে। এই বিধির ফলে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা পেশ করা কিংবা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইস্ট সাসেক্সের এই ক্যাম্পে আশ্রয়প্রার্থী স্থানান্তরের পরিকল্পনা গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই ছিল। তবে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে, এর আগে বিবি স্টকহোম বার্জে লেজিওনেলা ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সরকার বাড়তি সতর্কতা নেয়। সরকারের দাবি, ক্রোবরো ক্যাম্পে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি, কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশি যাচাই নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ২০২৯ সালের মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেল ব্যবহারের সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো হবে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সুপরিকল্পনার অভাব থাকলে করদাতাদের অর্থ অপচয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আগেই সতর্ক করেছিল হোম অ্যাফেয়ার্স সিলেক্ট কমিটি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক চিঠিতে সরকার জানায়, হোটেলগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি আগেভাগে বাতিল করতে হলে বিকল্প আবাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা জরুরি, যাতে আশ্রয়প্রার্থীদের সেবায় কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে। এই প্রসঙ্গে কমিটির চেয়ার ডেম কারেন ব্র্যাডলি বলেন, আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন চুক্তি ব্যবস্থাপনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়া একটি ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
