বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তির নাম এখন অনিবার্যভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, জেনারেশন জেড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে ওঠা, বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হওয়া জলবায়ু, যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বড় হওয়া এই প্রজন্ম আর নীরব থাকতে রাজি নয়। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপে জেন-জিদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন একের পর এক সরকারকে চাপে ফেলেছে, কোথাও ক্ষমতা বদলে দিয়েছে, কোথাও নীতিনির্ধারণে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

বাংলাদেশ, নেপাল, মরক্কো, মাদাগাস্কার, পেরু কিংবা মেক্সিকো, এই তালিকা এখন শুধু উন্নয়নশীল দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রেও জেন-জিদের ক্ষোভ রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও গভীর করেছে।

ইইউ দেশগুলোতে জেন-জিদের আন্দোলন

ইউরোপে জেন-জিদের আন্দোলনের চরিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে বিষয়গুলো শুধু দুর্নীতি নয়; বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, অভিবাসননীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচন।

ফ্রান্স

প্যারিসে বাজেট কাটছাঁট, শিক্ষাখাতে ব্যয় কমানো ও পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে জেন–জিরা রাস্তায় নামে। ‘ওয়ান পিস’-এর জলদস্যু পতাকা হয়ে ওঠে প্রতীক, রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বার্তা। ফরাসি সরকারের কঠোর পুলিশি পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত না করে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

জার্মানি

জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি ও অভিবাসন প্রশ্নে ডানপন্থীদের উত্থানের বিপরীতে জেন–জিরা বড় আকারের প্রতিবাদ গড়ে তোলে। অনেক তরুণ মনে করেন, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো জলবায়ু ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে তাঁদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ইতালি ও স্পেন

উচ্চ যুব বেকারত্ব, অস্থায়ী চাকরি ও আবাসন সংকট তরুণদের রাস্তায় নামিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ‘হারানো প্রজন্ম’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন তাঁরা।

বিশ্লেষকদের মতে, ইইউভুক্ত দেশগুলোতে জেন–জিদের আন্দোলন পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে গণতন্ত্র থাকলেও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে জেন–জি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে জেন–জিদের রাজনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা এখন ভোটার হিসেবেও বড় শক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরুত্থান, কট্টর অভিবাসননীতি, জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার ও সামাজিক বিভাজনমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে জেন–জিরা সোচ্চার। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে, ফিলিস্তিন–ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক বিক্ষোভ, পুলিশি সহিংসতা ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং নারী অধিকার ও গর্ভপাত আইন নিয়ে রাজ্যভিত্তিক প্রতিবাদ-সমাবেশ অুনষ্ঠিত হয়।

এসব আন্দোলনে জেন–জিরা ট্রাম্পপন্থী রাজনীতিকে “পেছনে ফিরে যাওয়ার রাজনীতি” বলে আখ্যা দেয়।

তবে বাস্তবতা হলো, জেন–জিদের ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম, যদিও তারা অনলাইনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প ও ডানপন্থী শক্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিন্ন কৌশলে তরুণদের একটি অংশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

জেন–জিরা রাস্তায় নামার কারণ

বিশ্বজুড়ে কারণগুলো প্রায় অভিন্ন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অভিজাতদের বিলাসিতা, তরুণ বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জলবায়ু সংকট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, এআই ও অটোমেশনের কারণে চাকরির সুযোগ সংকোচন এবং মূলধারার রাজনৈতিক দলের প্রতি অনাস্থা। এ বিষয়ে মার্কিন নীতিবিশ্লেষক ও প্রযুক্তি–নীতি বিশেষজ্ঞ ক্যাট ডাফি বলেন, এআই ও অটোমেশন চাকরির বাজারে যে চাপ তৈরি করছে, তা তরুণদের উন্নতির স্বপ্নকে আরও কঠিন করে তুলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুমিকা

ডিসকর্ড, টিকটক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, এসব প্ল্যাটফর্ম জেন–জিদের আন্দোলনের মেরুদণ্ড। তাদের দ্রুত সংগঠন তৈরি, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং প্রতীক ও পপ কালচারের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। কিন্তু একই সঙ্গে, স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব, স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখার ঘাটতি ও আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপান্তরের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যান্ড এরিয়া স্টাডিজ-এর গবেষক ও থাই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সামাজিক আন্দোলন–বিশেষজ্ঞ জানজিরা সোমবাতপুনসিরির ভাষায়…

বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ক সমতা দেয়, কিন্তু টেকসই শাসন কাঠামো তৈরি করে না।

সরকার গুলোর প্রতিক্রিয়া

বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো তিনটি পথে হাঁটছে, যেমন দমন–পীড়ন (সার্বিয়া, মরক্কো, ইরান), আংশিক সমঝোতা (ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, ফ্রান্স), ক্ষমতা পরিবর্তন (বাংলাদেশ, নেপাল, মাদাগাস্কার)।তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল সংস্কার এখনো অধরা।

সামনে কী?

২০২৬ সালে বাংলাদেশ, মরক্কো, নেপাল, পেরু ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্প–বিরোধী ও সমর্থক শক্তির সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জেন–জিরা যদি রাজনৈতিক দল গড়ে তোলে, নাগরিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয় এবং শুধু প্রতিবাদ নয়, নীতিনির্ধারণে অংশ নেয়, তাহলেই তারা সত্যিকারের পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারবে। নচেৎ, এই বৈশ্বিক জেন–জি জাগরণ ইতিহাসে আরেকটি শক্তিশালী কিন্তু অসম্পূর্ণ বিপ্লব হয়েই থেকে যাবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version