বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আরবি গ্রাফিতি, ময়লা-আবর্জনা ও ইসলামিক পোশাকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে লন্ডনের আইকনিক বিগ বেন!কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এরকম আরো অনেক ভ্রান্ত ভিডিওতে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ইউরোপের ডানপন্থি রাজনীতিবিদদের অনেকে এমন ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে দাবি করছেন, অভিবাসীদের আগমনের কারণে ইউরোপের শহরগুলো বদলে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ঘৃণা উসকে দিচ্ছেন। এসব ভিডিওর মূল বার্তা হলো, অভিবাসীরা শ্বেতাঙ্গদের স্থান দখল করে নিচ্ছেন!

বিশ্লেষকদের মতে, চ্যাটবট ব্যবহার করে খুব সহজেই এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যদিও এসব চ্যাটবটে ক্ষতিকর কনটেন্ট ফিল্টার করার ব্যবস্থা রয়েছে।

ব্রিটিশ-অ্যামেরিকান অলাভজনক সংস্থা সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেইট-এর সিইও ইমরান আহমেদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন…

কট্টর মতামত ছড়িয়ে দিতে এআই টুল ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরনের কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার ঠেকাতে যে মডারেশন ব্যবস্থা আছে, তা ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছে।

এলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’কে (সাবেক টুইটার) ঘৃণা ও ভুল তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী মাধ্যম বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

কারা ছড়াচ্ছেন এসব ভিডিও?

  • টমি রবিনসন: ব্রিটেনের কট্টর ডানপন্থি এই নেতা গত জুনে সামাজিক মাধ্যম এক্সে ‘লন্ডন ইন ২০৫০’ নামের একটি ভিডিও পোস্ট করেন। এআই দিয়ে বানানো ওই ভিডিওতে দেখানো হয়, ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর অভিবাসীদের দখলে চলে গিয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দেখা এই ভিডিওর নিচে এক দর্শকের মন্তব্য ছিল—‘বিপর্যয়ের মুখে ইউরোপ।’ লন্ডন ছাড়াও নিউইয়র্ক, মিলান ও ব্রাসেলস নিয়েও তিনি একই ধরনের ভিডিও পোস্ট করেছেন।
  • মার্টিন সেলনার: অস্ট্রিয়ার কট্টর জাতীয়তাবাদী এই রাজনীতিবিদও এ ধরনের ভিডিও প্রকাশ করে থাকেন।
  • স্যাম ভান রয়: বেলজিয়ামের ডানপন্থি সংসদ সদস্যও সাম্প্রদায়িক কনটেন্ট প্রকাশ করেন।
  • সিলভিয়া সারডোনে: ইটালির ডানপন্থি রাজনৈতিক দলের নেতা ও ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের সদস্য। গত এপ্রিলে মিলান শহরকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখানো একটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘‘আমরা কি ভবিষ্যতে সত্যিই এমনটা চাই?’’
  • গির্ট ভিল্ডার্স: নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দল পার্টি ফর ফ্রিডমের এই নেতা ২৯ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ‘নেদারল্যান্ডস ২০৫০’ নামে একটি এআই ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে মুসলিম নারীদের মতো হেডস্কার্ফ পরা এক নারীকে দেখিয়ে তিনি বলেন…

এই সময়ের মধ্যে ইসলাম হবে নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে বড় ধর্ম।

যদিও বর্তমানে নেদারল্যান্ডসে মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের বেট্রিজ লোপেস বুয়ারক সতর্ক করে বলেন, এমনসব ভিডিও ক্ষতিকরভাবে গতানুগতিক ধারণা (stereotypes) ছড়িয়ে দেয় এবং সহিংসতা উস্কে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, এআই ব্যবহার করে ব্যাপক হারে মানুষকে কট্টর করে তোলার বিষয়টি ক্রমেই পরিস্থিতিকে খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

টিকটকের পদক্ষেপ, তবুও দ্রুত ছড়াচ্ছে বিদ্বেষ

রাজনীতিবিদ রবিনসনের পোস্ট করা ভিডিওগুলোর নির্মাতার অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে টিকটক। প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছে, ষড়যন্ত্র তত্ত্বসহ ঘৃণ্য বার্তা ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলো তারা নিষিদ্ধ করছে। তবে সমস্যা হলো, এসব ভিডিও লাখ লাখ মানুষের কাছে খুব দ্রুত পৌঁছে যায় এবং কট্টরপন্থি রাজনীতিবিদরা সেগুলো সামাজিক মাধ্যমে ‘রিপোস্ট’ করে ছড়াতে থাকেন।

বিদ্বেষ ছড়ানো লাভজনক ব্যবসা!

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঘৃণা ছড়ানো ও সাম্প্রদায়িক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠছে। জানা গেছে, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ রবিনসনের পোস্ট করা ভিডিওটির নির্মাতা ছদ্মনামে মানুষকে টাকার বিনিময়ে এআই ক্লিপস বানানো শেখাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ষড়যন্ত্র তত্ত্বের এমনসব ভিডিওতে অনেক ক্লিক পড়ে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের বুরাক বলেন…

সমস্যা হচ্ছে, আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে ঘৃণা ছড়ানো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

তবে এএফপির ডিজিটাল রিপোর্টার যখন চ্যাটজিপিটি, জিআরওকে, জেমিনাই ও ভিইও ৩কে ২০৫০ সালের লন্ডন কেমন হবে তার ভিডিও বানিয়ে দিতে বলেছিল, তখন এআই অ্যাপগুলো ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছিল।

এআই ফরেনসিকের গবেষণা দলের প্রধান সালভাতোরে রোমানো বলেন…

কোনো এআইয়ের মডারেশনই শতভাগ নিখুঁত নয়। এই সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতিকারীরা অভিবাসন বা এ ধরনের বিষয়ে ভিডিও তৈরি করে থাকেন।

তবে এসব অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক ভিডিও প্রকাশ থেমে থাকছে না। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিবাসী এমনকি নাগরিকত্ব পাওয়া পরিবারগুলো। তাঁদের দাবি তাঁরা বৈধ উপায়ে এসব দেশে অভিবাসন ও নাগরিত্ব সুবিধা পেয়েছেন। সাম্প্রদায়িক উস্কানির ফলে ভবিষ্যতে তাঁদের বিড়ম্বনা এমনকি গুরুতর বিপদে পড়তে হতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়া সব পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version