বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ‑এর নামে যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নথিতে উল্লেখিত এসব স্থাবর সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড বলে জানানো হয়েছে, বাংলা টাকায় প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকারও বেশি মূল্য হতে পারে।
এই আদেশ বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)-এর এক পিটিশনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাঁকে এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের তদন্ত চলছে। দুদক‑এর পক্ষ থেকে উপ‑পরিচালক মো. মশিউর রহমান আদালতে আবেদন করেন এবং সরকারের আইনজীবী এই মামলায় যুক্ত হয়েছেন।
জব্দের এই আদেশ আসে সেই তদন্তের পর, যখন গত ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫‑এ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় একজন চালকের বাড়ি থেকে ২৩ বস্তা নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। এই নথিপত্রের বিশদ বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিকভাবে অর্জিত বা নিবন্ধিত সম্পত্তির তথ্য পাওয়া যায়, যার মধ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ফ্ল্যাট‑অ্যাপার্টমেন্টের বিস্তারিত তালিকাও ছিল। তদন্তকারী দল মনে করছে, এসব সম্পত্তি গোপনভাবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিক্রি বা স্থানান্তর হতে চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হতে পারে। তাই আদালতের মাধ্যমে জব্দের আদেশ চাওয়া হয়।
সূত্র জানায়, একটি নয় সদস্যের পৃথক তদন্ত‑দল গঠন করা হয়েছে যার মধ্যে, দুর্নীতি দমন কমিশন, আপরাধ তদন্ত বিভাগ(সিআইডি)ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর)‑এর কর্মকর্তারা রয়েছেন। এই দলই জব্দের পেছনের প্রাথমিক অনুসন্ধান পরিচালনা করে আসছে।
তদন্তের নথিতে পাওয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, বহু আন্তর্জাতিক দস্তাবেজে এসব নগদ সম্পদ প্রকৃতপক্ষে জাবেদ ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের নামে নিবন্ধিত আছে, যা দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ গঠনের সন্দেহকে আরও জোরালো করছে। দুদক‑এর পিটিশনে বলা হয়েছে, যদি এই সম্পত্তিগুলো জব্দ না করা হয় এবং বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে, তার ফলে আদালত দ্রুত জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আদেশটি উদ্ধৃতির জন্য সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
এই মামলা শুধুমাত্র জব্দের আদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আর্থিক হিসাব‑নথি জব্দ, ব্যাংক ট্রান্সঅ্যাকশন তদন্ত এবং অপরাধমূলক সম্পদের উৎস প্রমাণের জন্য গ্লোবাল সমন্বয় সম্পর্কিত প্রক্রিয়াকেও জোরদার করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সাবেক মন্ত্রীর চালকসহ আরও ৩৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রীর স্ত্রীসহ বিভিন্ন সহযোগী রয়েছে, এই মামলা শুধুমাত্র সম্পত্তি জব্দই নয়, বরঞ্চ একটি আরও বিস্তৃত দুর্নীতি ও অর্থপাচার তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ পূর্বে ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মন্ত্রীপর্যায়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী ছিলেন, এ সময় তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল সম্পদ তৈরি করার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এই অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সম্পদ সনাক্ত ও জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং এখন আদালতের আদেশ অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ মিলেছে।
যদিও বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান, তবে এই জব্দের সিদ্ধান্তটি রাষ্ট্রের কাছে আর্থিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে নেওয়া হয়েছে, বিশেষত এমন ক্ষেত্রে যেখানে কোনো পাবলিক ফাংশনার দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছে বলে সন্দেহ করা হয়। আগামী সময়ে এই মামলার প্রেক্ষাপটে আরও আইনি পদক্ষেপ, সাক্ষ্য‑প্রমাণ সংগ্রহ এবং গ্রেপ্তারি কার্যক্রম আরো জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
