অপরাধ প্রমাণিত হওয়া বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা বাড়াতে নতুন পদক্ষেপ নিতে চায় সুইডেন সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে গ্যাং সহিংসতা, অস্ত্র ও মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার মনে করছে, যেসব অ-নাগরিক সুইডেনে অবস্থান করে গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন, তাদের দ্রুত বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশন নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি অভিবাসন নীতিকে আরও “দায়িত্বশীল ও কঠোর” করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
বর্তমান ডানপন্থি জোট সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছে উল্ফ ক্রিস্তেশোন। তিনি বলেন, সুইডেনে বসবাসের সুযোগ মানে দেশের আইন ও মূল্যবোধ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার উল্লেখ করেছেন, যারা এই আস্থার অপব্যবহার করে অপরাধে জড়িত হন, তাদের জন্য সুইডেনে থাকার অধিকার সীমিত হওয়া উচিত। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কারাদণ্ড ভোগ করার পর দ্রুত বহিষ্কারের বিধান আরও কার্যকর করতে আইন সংশোধনের কথাও আলোচনায় রয়েছে। সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, গুরুতর সহিংস অপরাধ, সংগঠিত অপরাধচক্রে জড়িত থাকা, কিংবা পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আরও বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
সুইডেনে বহিষ্কার সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করে সুইডিশ মাইগ্রেশন এজেন্সি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আদালত কর্তৃক বহিষ্কারের আদেশ জারি হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, উৎপত্তি দেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তির সীমাবদ্ধতা, ভ্রমণ নথি জোগাড়ে বিলম্ব, কিংবা মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনি বাধা। নতুন পরিকল্পনার আওতায় সরকার এসব প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে চায়। বিশেষ করে যেসব দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রত্যাবাসন হার কম, সেসব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনাও জোরদার করা হতে পারে।
ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সুইডেন ইইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অভিন্ন প্রত্যাবাসন নীতিমালা ও মানবাধিকার সনদের অধীন। ইউরোপীয় আইনের আওতায়, কাউকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে আশ্রয়প্রাপ্ত শরণার্থী বা সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বহিষ্কার প্রক্রিয়া আরও জটিল। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনেই কঠোরতার পথ বেছে নেওয়া হবে; তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, দ্রুততার নামে আইনি সুরক্ষা যেন খর্ব না হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে যথাযথ বিচারিক পর্যালোচনা, আপিলের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। তাদের মতে, অনেক অভিবাসী দীর্ঘদিন সুইডেনে বসবাস করছেন, পরিবার গড়েছেন, সন্তানদের স্কুলে পড়াচ্ছেন, এমন অবস্থায় বহিষ্কার কেবল ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবারকে প্রভাবিত করতে পারে। অপরাধ দমনে কঠোরতা প্রয়োজন হলেও তা যেন বৈষম্যমূলক বা সমষ্টিগত শাস্তির রূপ না নেয়, সে বিষয়েও তারা জোর দিচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারপন্থী বিশ্লেষকরা বলছেন, সুইডেনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাং-সংক্রান্ত সহিংসতা এবং বিস্ফোরণের ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা বিদেশি পটভূমির হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে অভিবাসন নীতির কার্যকারিতা নিয়ে। সরকার মনে করছে, দোষী সাব্যস্ত অ-নাগরিকদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হলে অপরাধচক্রের প্রভাব কমবে এবং ভবিষ্যতে অপরাধে জড়ানোর প্রবণতাও নিরুৎসাহিত হবে। এটি একটি “ডিটারেন্স” বা প্রতিরোধমূলক বার্তা হিসেবেও কাজ করবে বলে তাদের ধারণা।
পরিসংখ্যানগতভাবে দেখা যায়, আদালত বহিষ্কারের নির্দেশ দিলেও সব ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয় না। অনেকেই কারাদণ্ড শেষে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই সরকার কারাগার ও মাইগ্রেশন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার উন্নত করা এবং পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি, অপরাধ সংঘটনের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কথাও আলোচনায় এসেছে।
সার্বিকভাবে, সুইডেনের এই উদ্যোগ দেশটির অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জনআস্থা পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার লক্ষ্যে সরকার বহিষ্কারের হার বাড়াতে চায়। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী মাসগুলোতে প্রস্তাবিত আইনি সংশোধন ও নীতিগত পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে সুইডেনের নতুন কৌশলের সাফল্য।
