সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার গল্পটি খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে যতটা নাটকীয়, ততটাই অনুপ্রেরণার। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এক চরম রাজনৈতিক শূন্যতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপির) হাল ধরেছিলেন তিনি। গত ৪৩ বছরে তিনি কেবল একটি দলের নেত্রী নন, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনিবার্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন।
রাজনীতির ময়দানে অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অটল পদার্পণ
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি যখন নেতৃত্ব সংকটে দিশেহারা, ঠিক তখনই ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে খালেদা জিয়ার। চল্লিশের কম বয়সে দলের হাল ধরে তিনি প্রমাণ করেন, নেতৃত্ব কেবল অভিজ্ঞতায় নয়, দৃঢ়তায় জন্মায়। ভাইস চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে চেয়ারপারসন হওয়া পর্যন্ত তাঁর যাত্রা ছিল দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এক কঠিন সংগ্রাম।
আপসহীন নেত্রী’র উত্থান ও স্বৈরাচার পতন
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হলো এরশাদবিরোধী আন্দোলন। দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে থেকে তিনি আপসহীন মনোভাব প্রদর্শন করেন। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে তাঁর নেতৃত্বই এরশাদ রাজত্বের পতন ত্বরান্বিত করেছিল। এর পুরস্কারস্বরূপ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
সংসদীয় গণতন্ত্র ও নারী নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত
বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়া ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পুরুষশাসিত সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে একজন নারীর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া ছিল সমকালীন বিশ্বের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি কেবল ক্ষমতায় বসেননি, বরং সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করে জনদাবির প্রতি শ্রদ্ধাও জানিয়েছিলেন।
সংকটে অটল
খালেদা জিয়ার জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময়। তৎকালীন সেনা-সমর্থিত সরকার তাঁকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দিলেও তিনি মাথা নত করেননি। তাঁর সেই কালজয়ী উক্তি…
বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশের মাটি ও মানুষই আমার সব
এ উক্তিটি তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দেয়। কারাবরণ, দুই সন্তানের ওপর নির্যাতন, ছোট ছেলের মৃত্যু এবং ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, প্রতিটি আঘাতই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। ২০১৫ সালে অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে ছোট ছেলেকে হারানো ছিল তাঁর জীবনের করুণ অধ্যায়, তবুও তিনি রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হননি।
জোট রাজনীতি ও সমঝোতার কৌশল
আদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তিনি বিভিন্ন সময় ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে জোট করেছেন। ৭-দলীয় জোট থেকে শুরু করে ২০-দলীয় জোট পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্ব ছিল সফল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, তিনি ছিলেন একজন “পরিস্থিতিবোদ্ধা নেতা”, যিনি প্রয়োজনবোধে সমঝোতা করতেও জানতেন।
প্রতিহিংসা নয়, শান্তির বার্তা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ কারাবন্দী জীবন থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যে বক্তব্য দেন, তা তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্কতার প্রমাণ দেয়। তিনি বলেন…
আসুন ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।
এই আহ্বান তাঁকে দল-মতনির্বিশেষে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য
খালেদা জিয়া নিজে কম বলতেন, অন্যের কথা শুনতেন বেশি। চরম সংকটেও দেশত্যাগ না করার অদম্য জেদ, শেষ জীবনে এসে প্রতিহিংসার বদলে জাতীয় ঐক্যের ডাক, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, দীর্ঘ ৪৩ বছর একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে সুসংগঠিত রাখার কীর্তি তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
শেষ কথা
খালেদা জিয়ার জীবন-ইতিহাস কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এক গৃহবধূর অদম্য সাহসে জননেত্রী হয়ে ওঠার মহাকাব্য। রূপ আর গুণের এই বিরল সংমিশ্রণে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, যা আগামী প্রজন্মের জন্য গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে।
