শুক্রবার, ২৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ সরকারের নতুন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের আওতায় প্রবাসী কর্মীদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য বিশেষ ভাতা প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান বিভাগ। এই ভাতা মূলত প্রবাসী কর্মীদের বেঙ্গল মাইগ্র্যান্ট ট্রাস্ট (বিএমটি) ছাড়পত্র অথবা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের (ডব্লিউইডব্লিউবি) মেম্বারশিপ গ্রহণকারী প্রবাসীদের সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং প্রতিবন্ধী সন্তানের বিশেষ চাহিদার খরচের বোঝা হ্রাস করা।

সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রবাসী কর্মীর প্রতিবন্ধী সন্তানেরা এই ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন প্রক্রিয়া সহজ এবং স্বচ্ছভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে সন্তানের প্রতিবন্ধিতা সনদ, প্রবাসী কর্মীর বৈধ কর্মসংস্থান ও বিএমইটি বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মেম্বারশিপ প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে। সরকারের উদ্দেশ্য হলো যে কোন ধরনের কাগজপত্র বা তথ্যের অস্পষ্টতা না থেকে প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা।

নির্বাচিত সন্তানেরা মাসিক ২ হাজার  টাকা হারে এই ভাতা পাবেন। ফলে বছরে মোট ২৪ হাজার টাকা করে প্রদেয় হবে। এই ভাতার মেয়াদ ধারাবাহিকভাবে ৭ বছর পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এক সন্তানের জন্য ৭ বছরের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা প্রদান করা হবে। এই অর্থে পরিবারগুলো প্রতিবন্ধী সন্তানের শিক্ষাব্যয়, চিকিৎসা, থেরাপি, বিশেষ সরঞ্জাম এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পারবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রবাসী পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

সরকারি নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, একজন প্রবাসী কর্মীর সর্বাধিক দুইজন সন্তান পৃথকভাবে আবেদনের মাধ্যমে এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। অর্থাৎ একজন প্রবাসীর দুইটি প্রতিবন্ধী সন্তান ভিন্ন আবেদনপত্রের মাধ্যমে এই ভাতা পেতে পারবে। এটি নিশ্চিত করছে যে পরিবারের প্রতিটি প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান হচ্ছে। যেসব পরিবারে একাধিক প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তারা সুবিধাটি পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করতে পারবেন, যাতে কোনো সন্তান আর্থিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।

শ্রম ও কর্মসংস্থান বিভাগের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের প্রাথমিক যাচাই এবং নিয়মিত মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পের আওতায় সরকার একটি ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে, যাতে আবেদন, অনুমোদন ও অর্থ প্রদানের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছভাবে ট্র্যাক করা যায়। এছাড়া, স্থানীয় ইউনিয়ন, থানা ও প্রবাসী কল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে। প্রবাসী পরিবারগুলো যাতে সময়মতো আবেদন করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে কোনো সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাসী কর্মীদের জন্য এই ধরনের ভাতা সামাজিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রবাসীরা যেহেতু বিদেশে কষ্ট ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন, তাই পরিবারের প্রতিবন্ধী সন্তানের চাহিদা পূরণে সরকারের সহায়তা তাদের মানসিক চাপ কমাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য আর্থিক সহায়তা না থাকলে পরিবারের সদস্যরা শিক্ষার, চিকিৎসার এবং সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এই ভাতা সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

প্রবাসী সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে সরকারের এই উদ্যোগের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তারা বলেছে, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পরিবারের প্রতি এই মনোযোগ প্রবাসী সমাজের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করবে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে আছেন, তাদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া, ভাতা প্রাপ্তির মাধ্যমে পরিবারগুলো প্রতিবন্ধী সন্তানের উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ধারাবাহিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পারবে।

এই ভাতা প্রকল্পের আওতায় আবেদন করতে হলে প্রবাসী কর্মীদের অবশ্যই বিএমইটি ছাড়পত্র বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সদস্য হতে হবে। বিএমইটি বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সদস্যপদ প্রমাণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নথিপত্র জমা দিতে হবে। আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রবাসী পরিচয়পত্র ও সন্তানের প্রতিবন্ধিতা সনদ বাধ্যতামূলক। আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থী তালিকাভুক্ত করা হবে।

সরকার আশা করছে, এই ভাতা প্রক্রিয়া দেশের প্রবাসী শ্রমিক সমাজে একটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রবাসীরা বিদেশে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ সন্তানদের উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারলে তাদের পরিবারিক জীবন আরও স্থিতিশীল হবে। পাশাপাশি, এটি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা নীতিকে শক্তিশালী করবে এবং প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তির একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।

সর্বশেষ, এই ভাতা প্রকল্পের আওতায় সরকার নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রক্রিয়ার আপডেট নিশ্চিত করবে। যাতে প্রাপ্ত পরিবারগুলো সহজে ভাতা গ্রহণ করতে পারে, কোনও প্রকার জটিলতা বা বিভ্রান্তি না থাকে। প্রবাসী শ্রমিক সমাজকে উদ্দেশ্য করে সরকার এই প্রকল্পকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

সংক্ষেপে, প্রবাসী কর্মীদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য এই নতুন ভাতা একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। মাসিক ২ হাজার টাকা হারে ৭ বছরের জন্য প্রদত্ত এই আর্থিক সহায়তা প্রবাসী পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। সরকারের এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে যে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং তাদের পরিবারের সুরক্ষা ও উন্নয়নে সরকারি তৎপরতা বজায় রাখা হচ্ছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version