যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশি ব্যাংকিং পরিষেবার চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা মূলত দুইটি কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে, একদিকে যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ঘরে টাকা পাঠানো বা লেনদেনের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও নিরাপদ করার প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নিজ দেশের ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করার সুবিধা, তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পারিবারিক সমর্থন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাজ্যে ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোতে প্রবাসীদের মাধ্যমে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার হার দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা দেখা গেছে ঢাকা, লন্ডন, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টার শহরের প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে। ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মূলত রেমিটেন্স, শিক্ষাবৃত্তি, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের জন্য নিজ দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে আগ্রহী।
প্রবাসীরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশি ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা তাদের জন্য খুবই কার্যকর। বিশেষ করে, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পাঠানো বা নেওয়া, বিল পরিশোধ করা এবং ঋণ সংক্রান্ত লেনদেন করা সহজ হয়েছে। এটি শুধু সময় বাঁচাচ্ছে না, বরং লেনদেনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছেন, প্রবাসীরা আগের তুলনায় এখন আরও আত্মনির্ভর, কারণ তারা ঘরে টাকা পাঠানোর পাশাপাশি শিক্ষার, স্বাস্থ্যসেবার এবং বিনিয়োগের জন্যও এই ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করছেন।
বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো যুক্তরাজ্যে নতুন শাখা স্থাপন ও রিমিটেন্স সার্ভিস সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রবাসী গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে তৎপর। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংকগুলোর অনলাইন লেনদেনের সুবিধা এখন ইউরোপিয়ান মান অনুযায়ী এসএসএল এবং দুই স্তরের যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুরক্ষিত। এতে গ্রাহকরা অনলাইন রেমিটেন্স বা অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় কোনো ঝুঁকি অনুভব করেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি-নির্ভর এই ব্যাংকিং সিস্টেম প্রবাসী বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা এবং সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখছে।
প্রবাসী ব্যবসায়ী ও ছাত্রছাত্রীরাও এই ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করছেন। ব্যবসায়ীরা মূলত বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কাঁচামাল আমদানি, বিক্রির লেনদেন এবং আয়-ব্যয় হিসাবের জন্য ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করছেন। একইভাবে, শিক্ষার্থী বা গবেষকরা পড়াশোনা, ফি প্রদান এবং লাইফস্টাইল ব্যয় পরিচালনার জন্য এই ব্যাংকিং সুবিধা ব্যবহার করছেন। ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে, কারণ প্রবাসীরা ঘরে থাকা পরিবারের সাথে অর্থ লেনদেন সহজ করতে চাইছেন।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য এটি একটি নতুন সুযোগ। প্রবাসী গ্রাহকদের জন্য নতুন ধরনের সেবা ও প্রোডাক্ট যেমন, আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ড, বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন, অনলাইন লোন সুবিধা এবং প্রবাসী সঞ্চয় হিসাব চালু করা হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো নতুন বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি প্রবাসীদের আর্থিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে।
এছাড়া, যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা ও প্রবাসী সংগঠনগুলোর মতে, এই ব্যাংকিং সেবার ফলে প্রবাসীরা ভুয়া লেনদেন বা অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি কমাচ্ছেন। বাংলাদেশি ব্যাংক সরাসরি রেমিটেন্স ও লেনদেনের দায়িত্ব নেওয়ায় অর্থ দ্রুত এবং নিরাপদে পৌঁছাচ্ছে। এটি বিশেষভাবে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা প্রবাসী আত্মীয়ের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশি ব্যাংকের জন্য যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশ মানে শুধু প্রবাসীর চাহিদা পূরণ নয়, বরং দেশের বিনিময় হার ও রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির জন্যও সহায়ক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, যুক্তরাজ্য থেকে প্রাপ্ত রেমিটেন্স দেশে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নতুন শাখা ও প্রবাসী-উন্মুখ প্রোডাক্টের মাধ্যমে এই প্রবাহ আরও স্থিতিশীল এবং নিরাপদ করা সম্ভব হচ্ছে।
এছাড়া, প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে তাদের সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা বা পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির জন্য বিদেশে অর্থ প্রেরণে ব্যাংকিং সুবিধার ব্যবহার কার্যকর হচ্ছে। প্রবাসী ছাত্রছাত্রীরা অনলাইনে ফি পরিশোধ, মাসিক খরচ এবং সঞ্চয়ের হিসাব রাখতে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন, যা তাদের আত্মনির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল হেল্পডেস্ক, কাস্টমার কেয়ার হটলাইন এবং কমিউনিটি আউটরিচ প্রোগ্রাম চালু করেছে। এতে প্রবাসীরা সহজে ব্যাংকিং বিষয়ক তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন এবং সমস্যা সমাধান করতে পারছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রবাসী গ্রাহকদের ভরসা ও ব্যাংকের প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি করছে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি-নির্ধারকরা এই প্রবণতাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তারা মনে করছেন, প্রবাসী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ব্যাংকিং সুবিধার সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতিকে বহুমাত্রিকভাবে শক্তিশালী করছে। প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ রেমিটেন্স প্রবাহ দেশের ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং সামাজিক উন্নয়নে সহায়ক হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন, ভবিষ্যতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অনলাইন স্বয়ংক্রিয় লেনদেন অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে লেনদেনের সময় কমবে, ব্যয় হ্রাস পাবে এবং নিরাপত্তা আরও বৃদ্ধি পাবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা আরও নির্ভরযোগ্য ও ব্যবহারবান্ধব হবে।
সর্বশেষে বলা যায়, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি ব্যাংকের চাহিদা বৃদ্ধি শুধু প্রবাসীদের আর্থিক সুবিধা নয়, দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, রেমিটেন্স প্রবাহ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। প্রবাসীরা এখন শুধু পরিবারকে অর্থ পাঠাচ্ছেন না, বরং ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও সুদৃঢ় করছে।
