ইতালির রাজধানী রোম-এর ব্যস্ত তেরমিনি স্টেশনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি নকল পণ্য জব্দ করেছে দেশটির অর্থনৈতিক ও শুল্ক আইন প্রয়োগকারী বাহিনী-গার্ডিয়া দি ফিনানজা। এ ঘটনায় দুই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। জব্দকৃত পণ্যের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তিপণ্য ব্র্যান্ড অ্যাপল–এর লোগোযুক্ত এক্সেসরিজ, নকল ডিউরাসেল ব্যাটারি এবং সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় ও উচ্চমূল্যের ‘লাবুবু’ আর্ট টয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, তেরমিনি রেলস্টেশন, যা ইতালির অন্যতম ব্যস্ত পরিবহন কেন্দ্র, সংলগ্ন এলাকায় কিছু দোকান ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নকল পণ্য বিক্রির অভিযোগ আসছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নজরদারি বাড়ানো হয় এবং পরিকল্পিত অভিযানে সংশ্লিষ্ট দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গুদামঘরে তল্লাশি চালানো হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ব্র্যান্ডের লোগো ও ট্রেডমার্ক অবৈধভাবে ব্যবহার করা পণ্য উদ্ধার করা হয়, যেগুলোর অধিকাংশেই যথাযথ আমদানি কাগজপত্র বা আসল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছিল না।
গার্ডিয়া দি ফিনানজা জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পণ্যগুলো অবৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে অথবা ইউরোপীয় বাজারে অনুমোদনহীন সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে আনা হয়েছে। নকল ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক এক্সেসরিজ ও ব্যাটারি বিক্রির মাধ্যমে ভোক্তাদের প্রতারণার পাশাপাশি জননিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের ব্যাটারি বা চার্জিং এক্সেসরিজ ব্যবহারে অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের আশঙ্কা থাকে, যা ভোক্তার জন্য বিপজ্জনক।
অভিযানে জব্দ হওয়া পণ্যের একটি বড় অংশ ছিল জনপ্রিয় আর্ট টয় ‘লাবুবু’। আন্তর্জাতিক বাজারে সংগ্রাহকদের কাছে এই চরিত্রভিত্তিক ফিগারগুলো অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন এবং সীমিত সংস্করণ হওয়ায় দামও তুলনামূলক বেশি। কর্তৃপক্ষের দাবি, জব্দকৃত খেলনাগুলোর অধিকাংশই নকল এবং এগুলোর প্যাকেজিং ও লোগো আসল পণ্যের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ক্রেতারা সহজে পার্থক্য বুঝতে না পারেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতালিতে ট্রেডমার্ক জালিয়াতি ও নকল পণ্য বিক্রি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা, পণ্য বাজেয়াপ্ত এবং কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশি ব্যবসায়ী তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনের চোখে অভিযুক্ত, অপরাধী নন, এ বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, তেরমিনি এলাকার মতো পর্যটকপ্রবণ জায়গায় নকল পণ্যের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। পর্যটকদের লক্ষ্য করে কমদামে ব্র্যান্ডেড পণ্য বিক্রির প্রলোভন দেখানো হয়। অনেক সময় পর্যটকরা আসল-নকল যাচাই না করেই পণ্য কিনে থাকেন। এতে শুধু ব্র্যান্ডের আর্থিক ক্ষতিই নয়, ভোক্তার অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়।
এদিকে ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রবাসীদের একটি ক্ষুদ্র অংশের অনিয়ম পুরো কমিউনিটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তারা সবার প্রতি বৈধ ব্যবসা পরিচালনা ও স্থানীয় আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে নকল পণ্যের বিস্তার একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে এসব পণ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্র রাজস্ব হারায় এবং বৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে ট্রেডমার্ক সুরক্ষা জোরদার ও সীমান্তে কাস্টমস নজরদারি বাড়ানো হলেও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত অভিযান ছাড়া এই চক্র পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জব্দকৃত ১ হাজার ৮০০ পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্য। তদন্তের অংশ হিসেবে পণ্যের উৎস, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য বৃহত্তর চক্রের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও নেওয়া হতে পারে।
রোমের ব্যবসায়িক মহল বলছে, বৈধ ব্যবসা রক্ষায় এমন অভিযান ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে একই সঙ্গে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে তারা অজান্তে অবৈধ সরবরাহ চেইনে যুক্ত না হন। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ব্র্যান্ডেড পণ্য আমদানি বা বিক্রির আগে যথাযথ লাইসেন্স ও অনুমোদন যাচাই করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, তেরমিনি এলাকায় এই অভিযান ইতালিতে নকল পণ্যবিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বড় বার্তা দিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে অভিযুক্তদের ভবিষ্যৎ। তবে ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে, ইউরোপের ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নকল পণ্যের বাজার এখনো সক্রিয়, এবং তা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
