শুক্রবার, ৬ই নভেম্বর, ২০২৬   |   ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপজুড়ে একের পর এক ভুয়া বোমা হামলার হুমকিতে বিপাকে পড়েছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল। গত কয়েক দিনে অন্তত ৩৪টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে এমন হুমকি পাওয়ার পর কয়েকটি ফ্লাইটের জরুরি অবতরণ ও গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনসের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঘটনাগুলো কোনো সমন্বিত চক্রান্তের অংশ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বৃহস্পতিবার ইতালি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ফ্রান্স, গ্রিস, সার্বিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের মধ্যে চলাচলকারী ফ্লাইটগুলো এসব হুমকির কারণে বিঘ্নিত হয়।

আক্রান্ত এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে রয়েছে রায়ানএয়ার, এয়ার লিঙ্গাস, উইজ এয়ার, ফিনএয়ার, ইজিজেট, এজিয়ান এয়ারলাইনস, আইবেরিয়া, স্কাই এক্সপ্রেস, এয়ার সার্বিয়া ও এলওটি পোলিশ এয়ারলাইনস। তবে সব উড়োজাহাজই শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করেছে। ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েও কোথাও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাজ্যের হিথ্রো ও বার্মিংহাম বিমানবন্দরও রাতভর একাধিক হুমকি বার্তা পায়। তবে মেট্রোপলিটন পুলিশের অ্যাভিয়েশন পুলিশ কমান্ডের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক তদন্তে সেগুলো ভুয়া বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হিথ্রোতে ওঠানামা করা চারটি উড়োজাহাজে পাওয়া হুমকি পর্যালোচনা করেও নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগে মঙ্গলবার একই ধরনের ভুয়া সতর্কবার্তার কারণে ইউরোপের সাতটি উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো হয় অথবা সেগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়। সোমবার যুক্তরাজ্য থেকে বুলগেরিয়াগামী একটি ফ্লাইটও ভিত্তিহীন হুমকির কারণে গন্তব্য পরিবর্তন করে। সব মিলিয়ে চলতি সপ্তাহে অন্তত ৩৩টি উড়োজাহাজ এমন হুমকির শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, এসব হুমকির পেছনে রাশিয়া বা ইরানের মতো কোনো শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

তবে ইউরোপজুড়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) বিমান চলাচলে এ ধরনের বিঘ্নের নিন্দা জানিয়ে হুমকিগুলোর উৎস শনাক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির অপারেশনস, সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট নিক কেয়ারিন এক বিবৃতিতে বলেন, বিমান চলাচল খাতে নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই যেকোনো হুমকিকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার অ্যাপোস্টোলোস সিটজিকোস্টাস বলেন, ঘটনাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে এ ধরনের হুমকি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

ইতালির রোম ও বুলগেরিয়ার সোফিয়া বিমানবন্দরে পাঠানো ইমেইলগুলোর সঙ্গে ‘মেল স্টেট’ নামে একটি গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে এসেছে। রোম বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ ও এএফপির সূত্র অনুযায়ী, হুমকির বার্তায় নিজেদের ‘মেল স্টেট’-এর যোদ্ধা দাবি করে লেখা হয়েছিল, ‘আমরা আজ আমাদের কর্মের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি করব। আপনাদের এই নারীবাদী শাসনব্যবস্থা সারা জীবন মনে রাখবে। আগামী ৬০ মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং আজ আপনাদের আকাশ লাল হয়ে উঠবে।’

মেল স্টেট ২০১৬ সালে ভ্লাদিস্লাভ পোজদনিয়াকভ প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ার একটি অতি-জাতীয়তাবাদী ও নারীবাদবিরোধী গোষ্ঠী। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্য সমর্থক পোজদনিয়াকভ অবশ্য টেলিগ্রামে এসব হুমকির দায় স্বীকার করেননি বা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

আয়ারল্যান্ডের কর্ক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে তারা টেলিফোনে একটি অজ্ঞাতপরিচয় হুমকি পায়। এতে বিমান চলাচলে বিলম্ব হয়। ধারণা করা হচ্ছে, হুমকির মুখে পড়া উড়োজাহাজটি লন্ডনের স্ট্যানস্টেড থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইট।

অন্যদিকে রায়ানএয়ারের পেসকারা-ব্রাসেলস রুটের একটি উড়োজাহাজের পেছনের শৌচাগারের দেয়ালে ‘বোমা’ শব্দটি লেখা দেখতে পেয়ে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়।

এতসব ঘটনার পরও ইউরোপের সামগ্রিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। ইউরোকন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ইউরোপের আকাশে প্রায় ২৭ হাজার ৪০০টি নির্ধারিত ফ্লাইট চলাচল করেছে।

এদিকে ডাবলিন থেকে ছেড়ে যাওয়া এয়ার লিঙ্গাসের একটি এয়ারবাস এ৩২০ উড়োজাহাজ বোমার হুমকির পর ফ্রান্সের ইভ্রেক্স সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে সেখানে অবতরণে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগে উড়োজাহাজটির পাইলটকে ফরাসি কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি সুপারমার্কেটের কোল্ড স্টোরেজের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনার পরপরই ইউরোপের বিমান চলাচলে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে রেফ্রিজারেটর হ্যাকিংয়ের ঘটনায় রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যেকোনো ঘটনার দায় চাপানোর একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

রোমে ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতোও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ফ্রান্সের হাসপাতালগুলোর রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানো, সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সাইবার হামলা কিংবা এ ধরনের ভুয়া হুমকি—সবকিছুর পেছনে পরোক্ষভাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

এই ছায়াযুদ্ধের নেপথ্যে কারা রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘আন্ডার-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার’ বলা হয়। এতে অপরাধীদের এমনভাবে আড়ালে রাখা হয়, যাতে সরাসরি কাউকে দায়ী করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আক্রান্ত ফ্লাইটগুলোর বড় একটি অংশ স্বল্প খরচের এয়ারলাইনসের হলেও হুমকিগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো ধরন শনাক্ত করা যায়নি। বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনই বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের ভুয়া সতর্কবার্তা পাওয়া যায়। তবে অল্প সময়ে এতগুলো বিশ্বাসযোগ্য হুমকি আসা সমন্বিত তৎপরতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

বিমানবন্দরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে উড়োজাহাজে বিস্ফোরক বহন করা কঠিন হলেও প্রায় ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় সামান্য ক্ষতিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে যেকোনো হুমকির পর উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন বা জরুরি অবতরণ ছাড়া এয়ারলাইনসগুলোর সামনে কার্যত বিকল্প থাকে না। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেটে ফ্লাইটের সময়সূচি ও উড্ডয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সহজলভ্য হওয়ায় হুমকিদাতারা এখন নির্দিষ্ট উড়োজাহাজ ও ফ্লাইটকে লক্ষ্য করে সহজেই বার্তা পাঠাতে পারছে।

ওসপ্রে ফ্লাইট সলিউশনসের এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ রিস জোন্সের মতে, বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও প্রচলিত নিরাপত্তা প্রোটোকল পরিবর্তন করা উচিত হবে না। তবে এ ধরনের ঘটনার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হলে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি গণমাধ্যমে এসব ঘটনার প্রচারও আরও বিস্তৃত হবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version