আগামী ১২ আগস্ট ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে যাচ্ছে স্পেনের মূল ভূখণ্ড। এই সূর্যগ্রহণের পথটি আইসল্যান্ড এবং গ্রিনল্যান্ডকেও স্পর্শ করবে। তবে এর চেয়েও বড় মহাজাগতিক চমক অপেক্ষা করছে আগামী বছরের গ্রীষ্মকালে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে প্রথমবার এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হতে যাচ্ছে, যার ধারাবাহিকতায় আগামী বছরের গ্রীষ্মে আরও দীর্ঘস্থায়ী সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
স্পেনের জন্য এই ঘটনাটি অত্যন্ত নজিরবিহীন। কারণ ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ বাদে স্পেনের সর্বশেষ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়েছিল ১৯১২ সালে, টাইটানিক জাহাজ ডুবির ঠিক দুই দিন আগে।
যেহেতু ১৯১২ সালের সেই বিরল হাইব্রিড গ্রহণটি বলয়গ্রাস (রিং-অব-ফায়ার) এবং স্পেনে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী হওয়া পূর্ণ গ্রহণের একটি মিশ্রণ ছিল, তাই অনেকেই ১৯০৫ সালকে দেশটির সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সূর্যগ্রহণ হিসেবে গণ্য করে থাকেন।
এই সূর্যগ্রহণের সাথে একই দিনে যুক্ত হতে যাচ্ছে একটি তীব্র উল্কাবৃষ্টি এবং আকাশে ছয়টি গ্রহের মিলনমেলা, যা মহাকাশকে এক অপূর্ব সৌন্দর্যে সাজিয়ে তুলবে।
আগামী ১২ আগস্ট সূর্য ডোবার সাথে সাথেই আইবেরিয়ান উপদ্বীপের (স্পেন ও পর্তুগাল) আকাশ হঠাৎ অন্ধকারে ঢেকে যাবে। সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী একই সরলরেখায় চলে আসায় গ্রিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের কিছু অংশও একই অন্ধকারের অভিজ্ঞতা লাভ করবে।
তবে এই গ্রহণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় নেবে। আম্ব্রা—সূর্যকে অবরুদ্ধ করা চাঁদের ছায়া—দেড় ঘণ্টায় প্রায় ৮,২৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে, যার বেশিরভাগ অংশই আটলান্টিক মহাসাগরের শূন্য জলসীমার ওপর দিয়ে যাবে।
উত্তর মেরুর কাছাকাছি জায়গা থেকে এই মহাজাগতিক খেলা শুরু হয়ে ধীরে ধীরে দক্ষিণে অগ্রসর হবে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণটি সর্বোচ্চ ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হবে। সবচেয়ে দীর্ঘতম পূর্ণ গ্রহণটি দেখা যাবে আইসল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে এবং ভূমধ্যসাগরে গিয়ে এই গ্রহণ প্রক্রিয়াটি শেষ হবে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষও এই দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।
আলাস্কা এবং সাইবেরিয়ার মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে কানাডা, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপ ও পশ্চিম আফ্রিকার বেশিরভাগ অংশ থেকে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে।
পূর্ণ গ্রহণের মূল পথের যত কাছাকাছি যাওয়া যাবে, সূর্যের তত বেশি অংশ চাঁদের আড়ালে ঢাকা পড়বে। ডাবলিনে সূর্যের ৯৪ শতাংশ এবং অসলোতে ৮৩ শতাংশ ঢাকা পড়বে। এছাড়া মন্ট্রিয়লে ১৮ শতাংশ, নিউ ইয়র্কে ৯ শতাংশ এবং ভার্জিনিয়ার নরফোকে ২ শতাংশ আংশিক গ্রহণ দেখা যাবে।
গ্রহণের সময় সূর্যের সামান্য অংশ দেখা গেলেও চোখের সুরক্ষায় বিশেষ সানগ্লাস ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
এই মহাজাগতিক বিস্ময়কে আরও বাড়িয়ে তুলতে ভোর হওয়ার আগেই আকাশের এক কোণে ছয়টি প্রতিবেশী গ্রহ এক রেখায় বৃত্তাকারে সমবেত হবে এবং নতুন চাঁদের রাতে পারসিড উল্কাবৃষ্টির সর্বোচ্চ রূপ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে দিনের সমাপ্তি ঘটবে।
এই গ্রহণ সরাসরি সম্প্রচার করতে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) স্পেনের জ্যাভালামব্রে অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অবজারভেটরি থেকে লাইভ ওয়েবকাস্টের আয়োজন করবে এবং লিওনে একটি গণ-উদযাপনের ব্যবস্থা করবে।
নাসা ছাড়াও ইতালিভিত্তিক ভার্চুয়াল টেলিস্কোপ প্রজেক্ট এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোও এটি সরাসরি সম্প্রচার করবে।
ইএসএ-র বিজ্ঞান পরিচালক ক্যারোল মান্ডেল বলেন, ‘আমার কাছে এটি কেবল কোনো বৈজ্ঞানিক মুহূর্ত নয়। এটি কেবল স্বর্গীয় বস্তুর এক অবিশ্বাস্য সারিবদ্ধতা নয়। এটি একই সাথে অত্যন্ত মানবিক একটি মুহূর্ত। এটি আমাদের মাঝে একটি বাস্তব মানবিক সংযোগ তৈরি করে, যেখানে আমরা পৃথিবীর বুকে পা রেখে মহাবিশ্বকে প্রত্যক্ষ করি।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ গবেষণা দলগুলোও এই মহাজাগতিক খেলায় শামিল হতে প্রস্তুত। গ্রহণের সময় তাপমাত্রা সাময়িকভাবে হ্রাস পাওয়ার প্রভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং অন্যান্য পরিবর্তনগুলো অধ্যয়নের জন্য তারা স্পেন এবং আইসল্যান্ড থেকে ৬০টিরও বেশি উচ্চ-উচ্চতার (হাই-অল্টিটিউড) বেলুন উৎক্ষেপণ করবে।
২০২৪ সালে উত্তর আমেরিকায় হওয়া পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় উৎক্ষেপণ করা বেলুনের তুলনায় এই সংখ্যাটি ১০ গুণ বেশি।
নাসার অর্থায়নে পরিচালিত এই বেলুন প্রকল্পের নেতৃত্বদানকারী মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যাঞ্জেলা ডেস জারডিন্স বলেন, ‘কয়েক মিনিট হয়তো খুব বেশি সময় নয়, তবে এটি বায়ুমণ্ডলকে প্রভাবিত করতে এবং পৃথিবীতে চাঁদের সেই ঠান্ডা ও অন্ধকার ছায়া তৈরি করার জন্য যথেষ্ট সময়।’
সামনে আরও মহাজাগতিক আয়োজন রয়েছে। ২০২৭ সালে একটি নজিরবিহীন দীর্ঘস্থায়ী পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হতে যাচ্ছে, যা বিজ্ঞানীদের প্রায় তিন গুণ বেশি পর্যবেক্ষণের সময় দেবে।
২০২৭ সালের ২ আগস্ট স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রান্ত এই সূর্যগ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু হবে। এটি সর্বোচ্চ ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হবে এবং এর পরিধি মরক্কো, আলজেরিয়া, লিবিয়া, মিশর, সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং সোমালিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
এরপর ২০২৮ সালের ২৬ জানুয়ারি একটি রিং-অব-ফায়ার বা বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে, যা স্পেনের আকাশে মহাজাগতিক এক হ্যাটট্রিক পূর্ণ করবে। ইএসএ-র মান্ডেলের মতে এটি হবে একটি ‘ভাগ্যবান কাকতালীয় ঘটনা’।
বেলজিয়ামের রয়্যাল অবজারভেটরির আন্দ্রেই ঝুকভ কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক সূর্যগ্রহণ নিয়ে কাজ করে চলেছেন।
তাঁর প্রোবা-৩ সায়েন্স মিশন গত দুই বছরে ৬০টিরও বেশি কৃত্রিম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ তৈরি করেছে। দুটি কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে তৈরি করা এই কৃত্রিম গ্রহণের সবচেয়ে দীর্ঘতমটি স্থায়ী হয়েছিল ৫ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট।
ঝুকভ বলেন, ‘আমরা আরও সূর্যগ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছি, তা প্রাকৃতিক হোক বা কৃত্রিম।’
