গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর শীতের শুরুটা একটু ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ বছর ইউরোপের অনেক দেশে অকাল তুষারপাত শুরু হয়েছে। যে দেশগুলোতে ডিসেম্বরের আগে বরফের দেখা মিলত না, সেখানে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই তুষারের চাদর জমেছে। ফিনল্যান্ড, সুইডেন-এর মতো দেশগুলোতে তো বটেই, এমনকি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল থেকেও প্রবাসীরা জানাচ্ছেন এক তীব্র শীতল অনুভূতির কথা। এই হাড়কাঁপানো শীত কেবল শরীরের হাড়েই কাঁপন ধরাচ্ছে না, অনেকের মনেও জমিয়ে দিচ্ছে বিষণ্ণতার কালো মেঘ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্যাড’ বা ঋতুগত সংবেদনশীল ব্যাধি।
যে কারণে বিষণ্ণতা বাড়ে
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী মেঘলা আকাশ মানুষের শরীরে ‘মেলাটোনিন’ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করছে। সূর্যালোকের অভাবে মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ (যা আমাদের আনন্দ দেয়) কমে যায়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মেডিকেল জার্নাল বলছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা এই সমস্যায় পুরুষদের চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি আক্রান্ত হন। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার মতো রৌদ্রোজ্জ্বল দেশ থেকে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন, তাদের জন্য এই চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি।
লক্ষণ
কোনো কাজে উৎসাহ না পাওয়া এবং নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, অতিরিক্ত ঘুম বা বিছানা ছেড়ে উঠতে না পারা, মিষ্টি বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের প্রতি আসক্তি বেড়ে যাওয়া, তীব্র উদ্বেগ এবং খিটখিটে মেজাজ এবং বন্ধু-বান্ধব বা সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া।
উত্তরণের উপায়
এ বছর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা উইন্টার ডিপ্রেশন মোকাবিলায় প্রথাগত পদ্ধতির পাশাপাশি কিছু বিশেষ অভ্যাসের ওপর জোর দিচ্ছেন। যেমন:
মাইন্ডফুলনেস ও একসেপটেন্স: প্রকৃতির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই, এই সত্যটি গ্রহণ করাই হলো মানসিক প্রশান্তির প্রথম ধাপ। ‘বডি স্ক্যান মেডিটেশন’ বা নিজের শরীরের অনুভূতির ওপর মনোযোগ দিলে মন বর্তমান মুহূর্তের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
লাইট থেরাপি: এই শীতে অনেক দেশে ‘লাইট থেরাপি বক্স’ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। প্রাকৃতিক সূর্যের আলোর অভাব পূরণ করতে কৃত্রিম এই আলো প্রতিদিন সকালে ২০-৩০ মিনিট ব্যবহার করলে শরীরে সেরোটোনিন হরমোন বাড়ে।
শরীরচর্চা ও খাদ্যাভ্যাস: শীতের আলসেমি কাটাতে হালকা ইয়োগা বা ঘরের ভেতর ব্যায়াম করা শরীর ও মনের সংযোগ বজায় রাখে। এছাড়া ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার এ সময় মানসিক অবস্থা উন্নত করতে সহায়ক।
ভার্চুয়াল কানেক্টিভিটি ও প্রিয়জন: প্রবাস জীবনে একাকীত্ব দূর করতে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে নিয়মিত কথা বলা জরুরি। ভিডিও কলে প্রিয়জনদের মুখ দেখা এবং নিজের অনুভূতি শেয়ার করা এক ধরনের থেরাপির কাজ করে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: যদি এই বিষণ্ণতা দৈনন্দিন জীবনকে অচল করে দেয়, তবে দেরি না করে অবশ্যই একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের পরামর্শ নিতে হবে। অনেক দেশে এখন অনলাইন থেরাপি বা টেলি-কাউন্সেলিংয়ের সুবিধা রয়েছে।
শীত মানেই কেবল বরফ বা জবুথবু অবস্থা নয়; এটি নিজেকে চেনার এবং নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়ারও সময়। এই তীব্র শীতকে মোকাবিলা করতে হবে সচেতনতা আর ধৈর্য দিয়ে। মনে রাখতে হবে, শীতের পরেই আসে বসন্ত, প্রকৃতিতে যেমন, আমাদের মনেও তেমন।
