বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কাজ, পড়াশোনা ও স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী। উন্নত জীবনযাপন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলেও জলবায়ু ও পরিবেশগত পার্থক্যের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, একটি নীরব কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর সমস্যা।

বাংলাদেশের মতো রোদপ্রাচুর্যের দেশে বড় হওয়া মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবেই সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি সংগ্রহে অভ্যস্ত। কিন্তু ইউরোপের বহু দেশে বছরের বড় একটি সময় সূর্যের আলো সীমিত, বিশেষ করে শীতকালে। ফলে ইউরোপে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ অজান্তেই ভিটামিন ডি ঘাটতিতে ভুগছেন।

ইউরোপে ভিটামিন ডি ঘাটতির ঝুঁকি

চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, ইউরোপে বসবাসকারী প্রবাসীদের মধ্যে ভিটামিন ডি ঘাটতির কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, বছরের বড় সময় সূর্যের আলো কম পাওয়া, ঠান্ডার কারণে শরীর পুরোপুরি ঢেকে রাখা, দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতর বা অফিসে কাজ করা, নাইট শিফট বা ইনডোর জব, খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবারের অভাব এবং ত্বকের রঙ তুলনামূলক গাঢ় হওয়ায় সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি শোষণ কম হওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে বসবাসকারী দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

ভিটামিন ডি-এর গুরুত্ব

ভিটামিন ডি শুধু হাড়ের জন্য নয়, পুরো শরীরের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এটি ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে, হাড় ও দাঁত মজবুত রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, পেশির শক্তি বজায় রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ভিটামিনের ঘাটতি দীর্ঘদিন থাকলে ধীরে ধীরে শরীরে নানা জটিলতা তৈরি হয়।

ভিটামিন ডি-এর অভাবে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে

চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিতে যে সমস্যাগুলো সাধারণত দেখা যায়, এরমধ্যে রয়েছে, হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা, পেশি দুর্বলতা ও শরীর ব্যথা, অল্প কাজেই অতিরিক্ত ক্লান্তি, বারবার সর্দি-কাশি বা সংক্রমণ, মন খারাপ থাকা, অবসাদ বা ডিপ্রেশন, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, বয়স্কদের ক্ষেত্রে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের আশঙ্কা এবং শিশুদের ক্ষেত্রে হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া। অনেক সময় এসব উপসর্গকে মানুষ বয়সজনিত বা কাজের চাপ ভেবে উপেক্ষা করেন, যা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ইউরোপে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সপ্তাহে অন্তত ২–৩ দিন ২০–৩০ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকা, তবে মুখ, হাত বা বাহুতে সরাসরি সূর্যের আলো পড়লে উপকার বেশি হয়।এছাড়া বিশেষজ্ঞরা খাদ্যতালিকায় ডিমের কুসুম, সামুদ্রিক মাছ (স্যালমন, টুনা, ম্যাকেরেল), দুধ ও দুধজাত খাবার, ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ ফোর্টিফায়েড খাবার, নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা, নিজের ইচ্ছায় ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট শুরু না করা এবং বছরে অন্তত একবার ভিটামিন ডি লেভেল পরীক্ষা করানোরও পরামর্শ দিয়েছেন।

ডাক্তারের শরণাপন্ন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন থাকলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন, হাড়, কোমর বা পিঠে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত ক্লান্তি, পেশিতে টান বা দুর্বলতা, মনমরা ভাব, উদ্বেগ বা ঘুমের সমস্যা ও বারবার অসুস্থ হয়ে পড়া বা সংক্রমণ।চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নির্ধারণ করবেন।

যেভাবে ঝুঁকি কমবে

চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি একটি নীরব কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা। সময়মতো সচেতন হলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে সহজেই সুস্থ থাকা সম্ভব।

ইউরোপে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসীদের সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবন বজায় রাখতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সচেতন জীবনযাপন এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version