সোমবার, ২৩শে মার্চ, ২০২৬   |   ১০ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আমেরিকান ড্রিম বা ‘মার্কিন স্বপ্ন’—এক সময় যা ছিল বিশ্বজুড়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষার তুঙ্গে, আজ সেই স্বপ্নের সংজ্ঞাই যেন বদলে যাচ্ছে। খোদ মার্কিন নাগরিকরাই এখন নিজেদের পাসপোর্ট ত্যাগের কথা ভাবছেন। আর তাদের এই নতুন গন্তব্য আটলান্টিকের ওপারের দেশ পর্তুগাল। সম্প্রতি এক জরিপে উঠে এসেছে এমন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা বিশ্ব রাজনীতি ও অভিবাসন বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

আমেরিকানদের মনবদল: জরিপ কী বলছে?

গত ১৭-১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে ‘পর্তুগালিস্ট ডটকম’ পর্তুগালে বসবাসরত ও দেশটিতে যেতে ইচ্ছুক ২০০ জন মার্কিন নাগরিকের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক (৪৯ শতাংশ) আমেরিকানই পর্তুগিজ নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তাদের জন্মসূত্রে পাওয়া মার্কিন নাগরিকত্ব বর্জন করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলেছেন এবং ১৯.৫ শতাংশ জানিয়েছেন তারা বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। বিপরীতে মাত্র ৪৫ শতাংশ তাদের মার্কিন পরিচয় ধরে রাখতে চান।

কেন এই বিমুখতা? রাজনীতি নাকি ট্যাক্স?

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টগুলোর একটি থাকার পরও কেন এই বিরাগ? জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮১ শতাংশেরও বেশি মানুষ এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি’কে দায়ী করেছেন। নিজ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মেরুকরণ তাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে।

অন্যদিকে, যারা ইতিমধ্যে পর্তুগালে স্থায়ী হয়েছেন, তাদের ৩৮ শতাংশের আপত্তির জায়গাটি একটু ভিন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল ‘গ্লোবাল ট্যাক্স ফাইলিং’ সিস্টেম বা বিশ্বব্যাপী আয়ের ওপর কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পেতে চান তারা। পর্তুগালের শান্ত জীবনযাত্রা ও সহজ কর ব্যবস্থার তুলনায় নিজ দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে এখন বোঝা মনে করছেন অনেক আমেরিকান।

পর্তুগালই যখন শেষ ঠিকানা

পর্তুগালের ‘ডি-সেভেন’ ভিসা, ডিজিটাল নোমাড ভিসা কিংবা এক সময়ের জনপ্রিয় গোল্ডেন ভিসা আমেরিকানদের কাছে দেশটিকে স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। পর্তুগালের অভিবাসন সংস্থা আইমা এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে প্রায় ১৯ হাজার ২৫৮ জন আমেরিকান দেশটিতে বাস করছিলেন। বর্তমান জরিপ বলছে, ৩৫.৫ শতাংশ উত্তরদাতা আর কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে চান না। যারা পর্তুগালে থিতু হয়েছেন, তাদের মধ্যে এই হার আরও বেশি—প্রায় ৪৪.২ শতাংশ।

পর্তুগালিস্ট ডটকম-এর প্রতিষ্ঠাতা জেমস কেভ জানান, আমেরিকানরা পর্তুগালের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও পথটি খুব একটা মসৃণ নয়। বর্তমানে পর্তুগিজ নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘ ব্যাকলগ ও আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি। এছাড়া পর্তুগাল সরকার নাগরিকত্ব পাওয়ার সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ কাজ করছে।

এক সময় মানুষ উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাত। আর এখন খোদ আমেরিকানরাই ইউরোপের এক শান্ত দেশে থিতু হতে নিজেদের পরিচয় বিসর্জন দিতে কুণ্ঠিত হচ্ছেন না। আটলান্টিকের দুই পাড়ের এই বিপরীতমুখী অভিবাসন চিত্র কি বিশ্ব ব্যবস্থার কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? উত্তর তোলা রইল সময়ের হাতে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version