মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২৬   |   ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক গণভোটের ১০ বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসেও যুক্তরাজ্য যেন এক গভীর বিভাজনের বৃত্তে বন্দি। ব্রেক্সিট কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি ব্রিটিশ সমাজকে এমনভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে যা প্রতিবেশী, সহকর্মী এমনকি পরিবারগুলোর মধ্যেও স্থায়ী দেওয়াল তুলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ব্রেক্সিটপন্থীদের মাত্র ৪০ শতাংশ অপর পক্ষের সাথে রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে রাজি। এক পক্ষের মানুষ অপর পক্ষের সাথে ঘর ভাগাভাগি করতে বা পারিবারিক সম্পর্ক গড়তেও এখন চরম অনাগ্রহী। এই বিভাজন কেবল নীতি নিয়ে নয়, বরং ‘বাস্তবতা’ নিয়েও। এমনকি ২০২৪ সাল পর্যন্তও দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা কী, তা নিয়ে দুই পক্ষের মূল্যায়ন ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের রাজনীতি ছিল শ্রেণিভিত্তিক, যা টনি ব্লেয়ারের আমল থেকে বদলে যেতে শুরু করে এবং বর্তমানে তা সাংস্কৃতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। লেবার পার্টি যখন নিজেকে মধ্যবিত্তের দল হিসেবে ঘোষণা করল, তখন থেকেই শ্রমিক শ্রেণির ভোটব্যাংকে ধস নামে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার শ্রমিক শ্রেণির পটভূমি নিয়ে গর্ব করলেও, বিশ্লেষকদের মতে তা মূলত ‘লোকদেখানো’ এবং অর্থবহ পরিবর্তনের চেয়ে ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ পতাকা ওড়ানোর মতো প্রতীকী বিষয়েই বেশি সীমাবদ্ধ। রাজনীতি থেকে যখন অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভেদ মুছে যায়, তখন জন্ম নেয় সাংস্কৃতিক সংঘাত। ব্রেক্সিটপন্থীদের কাছে অভিবাসন ছিল সেই ‘বেসবল ব্যাট’, যা দিয়ে তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেছে।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, ব্রেক্সিট-পরবর্তী রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর চেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। অভিবাসন, বৈদেশিক সাহায্য বা মৃত্যুদণ্ডের মতো বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই থাকলেও; আয় বৈষম্য দূর করা বা শ্রমিকদের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই পক্ষেরই বলার মতো তেমন কিছু নেই। এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হয়েছে উচ্চবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণি। উদাহরণস্বরূপ, ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর মাত্র একটি বক্তৃতার জন্য তার এক বছরের বেতনের সমান অর্থ আয় করেছেন। যারা ব্রেক্সিট নামক জাতীয় ভাঙন ও বিপর্যয় তৈরি করেছিলেন, তারাই এখন লাভজনক পরামর্শক সংস্থা খুলে মুনাফা লুটছেন, আর সাধারণ মানুষ পড়ে রয়েছে এক অন্তহীন মেরুকরণ ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version