বৃহস্পতিবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তখন বয়স মাত্র ২১ বছর। জীবনটা গুছিয়ে নেওয়ার সময়। কিন্তু চিকিৎসকের একটি কথায় মুহূর্তেই বদলে যায় বেকি জোন্সের জীবন। তাকে জানানো হয়, তিনি মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত এবং হাতে সময় আছে মাত্র কয়েক মাস।

সেই ভুল রোগ নির্ণয়ের ভিত্তিতে পরবর্তী ১১ বছর কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে বেকিকে। বমি, অসহ্য যন্ত্রণা আর প্রচণ্ড ক্লান্তি হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। পরিবারের আনন্দ-উৎসবে অংশ নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, থেমে যায় সামাজিক জীবন, এমনকি ক্যারিয়ারও এগোয়নি।

এখন বেকির বয়স ৩৪ বছর। তিনি দুই সন্তানের মা। সম্প্রতি জানতে পেরেছেন, তার মস্তিষ্কে কোনো দিনই ক্যানসার ছিল না। যে রোগের চিকিৎসায় ১১ বছর কেমোথেরাপি নিয়েছেন, সেটি আসলে মস্তিষ্কের প্রদাহ। সাধারণ কিছু প্রদাহনাশক ও স্টেরয়েড ওষুধেই যার চিকিৎসা সম্ভব ছিল।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার (ইউএইচসিডব্লিউ) এনএইচএস ট্রাস্টের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া ৪০ জনের বেশি ভুক্তভোগীর একজন বেকি।

বেকি বলেন, ‘আমাকে বারবার বলা হয়েছিল, কেমোথেরাপি না নিলে আমি মারা যাব।’

কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট প্রফেসর ইয়ান ব্রাউন তাকে বলেছিলেন, জীবনের বাকি সময় নিয়মিত ‘টেমোজোলোমাইড’ (টিএমজেড) নামের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। এটি এক ধরনের কেমোথেরাপির ওষুধ।

মস্তিষ্কের একাধিক স্ক্যানে টিউমারের স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়ার পর বেকি যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, তখন তাকে বলা হয়, তার ক্যানসার খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়।

দীর্ঘদিন পর ২০২৫ সালে ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ক্যানসার রোগীদের পুরোনো নথি নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হলে সামনে আসে আসল তথ্য।

বেকি বলেন, ‘আমার কোনো দিনই ক্যানসার ছিল না। ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো অনর্থক কেমোথেরাপি নিয়ে কাটাতে হয়েছে। তিনি (চিকিৎসক) আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছেন।’

প্রফেসর ইয়ান ব্রাউনের আরও কয়েকজন রোগী বিবিসির কাছে অভিযোগ করেছেন, বছরের পর বছর তাদের টিএমজেড দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পরে শরীরে গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়।

এক নারী জানান, অতিরিক্ত কেমোথেরাপির কারণে তিনি স্থায়ীভাবে সন্তান ধারণের সক্ষমতা হারিয়েছেন। আরেক রোগী অপ্রয়োজনে ১০০টির বেশি কেমোথেরাপির সাইকেল নেওয়ার পর সত্যিই ক্যানসারে আক্রান্ত হন।

রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের (আরসিপি) প্রাথমিক পর্যালোচনায়ও গুরুতর গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, ওই হাসপাতালে বছরের পর বছর রোগীদের শক্তিশালী কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে। একজন রোগীকে ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে নিয়মিত মুখে খাওয়ার কেমোথেরাপি দেওয়া হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, তা বিস্ময়কর।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ট্র্যাজেডি

২০১২ সালে তীব্র মাইগ্রেনের সমস্যায় ভুগছিলেন বেকি। তখন এক প্রাইভেট নিউরোসার্জন তার মস্তিষ্কের বায়োপসি করেন।

আইনি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাবনার্সের প্রতিনিধি ফিওনা টিন্সলে জানান, বায়োপসির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসার আগেই প্রফেসর ইয়ান ব্রাউন বেকিকে জানান, তিনি চতুর্থ ধাপের ‘গ্লিওব্লাস্টোমা’ বা মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত।

এমনকি চিকিৎসক তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি আর কখনো মা হতে পারবেন না। যদিও পরে বেকি দুই সন্তানের জন্ম দেন।

২০২৪ সালে হঠাৎ একদিন হাসপাতাল থেকে ফোন করে বেকিকে জানানো হয়, তার কেমোথেরাপি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কেন তা বন্ধ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। শুধু জানানো হয়, প্রফেসর ইয়ান ব্রাউন অবসরে গেছেন।

এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে আইনজীবীদের নির্দেশে প্রাইভেট নিউরোসার্জন ও রেডিওলজিস্টদের একটি দল বেকির পুরোনো সব চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা করে।

পরে ভিডিও কলে আইনজীবীরা তাকে জানান, তার কোনো দিনই ক্যানসার ছিল না।

হাসপাতালের তদারকি নিয়েও প্রশ্ন

আরসিপির প্রাথমিক তদন্তে ২০টি মামলার নথি পর্যালোচনা করে ১৫টিতেই গুরুতর গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসকের কাজের ওপর যথাযথ তদারকি ছিল না। এমনকি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যেও রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হতো না।

বেকি বলেন, ‘ঘটনাটি শুধু ইয়ান ব্রাউন কী করেছেন, তা নিয়ে নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কীভাবে তাকে এত দিন এমন কাজ করতে দিল, সেটিও প্রশ্ন। মনে হতো, যেন তিনি আলাদা একটি রাজ্য চালাচ্ছেন। আর তা দেখার কেউ নেই।’

ইউএইচসিডব্লিউ এনএইচএস ট্রাস্টের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের নতুন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি স্বাধীন দলের মাধ্যমে হাসপাতালের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

অভিযুক্ত কনসালট্যান্ট ইয়ান ব্রাউনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version