সোমবার, ১লা জুন, ২০২৬   |   ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরো ইউরোপ জুড়ে যখন রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নতুন নতুন রেলপথ নির্মাণের ধুম পড়েছে, তখন আয়ারল্যান্ড হাঁটছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে। গত সপ্তাহে দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ওয়াটারফোর্ড আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি উচ্চাভিলাষী ৩০ মিলিয়ন ইউরোর প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। মার্কিন বেসরকারি বিনিয়োগে অর্থায়িত এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ করা, যাতে বড় বড় জেট বিমান এখানে অবতরণ করতে পারে। এই প্রকল্পের ডেভলপাররা আগামী তিন বছরের মধ্যে বছরে ৪ লক্ষ যাত্রী পরিবহনের একটি বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জেট বিমান চলাচলের সুবিধার্থে রানওয়েটি ২,২৮৭ মিটার দীর্ঘ এবং ৪৫ মিটার প্রশস্ত করা হবে, যার কাজ আগামী বছরের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। আয়ারল্যান্ডে বছরের পর বছর ধরে চলা প্রকল্প বিলম্ব ও পরিকল্পনাগত স্থবিরতায় সাধারণ মানুষ যখন ক্লান্ত, তখন এই প্রকল্পের সরাসরি বাস্তবায়ন তাদের মনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে নতুন এই বিমানবন্দরটি চালু হলে মুনস্টার প্রদেশে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংখ্যা দাঁড়াবে চারটিতে, যার দুটি ব্যক্তিগত এবং দুটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন। ফলে রুট নিশ্চিত করার জন্য বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে অবতরণ চার্জ নিয়ে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।

অবশ্য ওয়াটারফোর্ড বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী উইলিয়াম বোলস্টার এই প্রকল্পটিকে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তাঁর মতে, এই বিমানবন্দরটি কর্ক বিমানবন্দরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বরং তার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, কারণ এখান থেকে মাত্র ৬০ মিনিটের গাড়িপথের দূরত্বে প্রায় ৬ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। উল্লেখ্য, আয়ারল্যান্ডের অন্যান্য বিমানবন্দরগুলো বর্তমানে রেকর্ড সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করছে। গত বছর কর্ক বিমানবন্দর প্রায় ৩৫ লক্ষ এবং কেরি বিমানবন্দর প্রায় ৫ লক্ষ যাত্রী পরিবহন করে তাদের ইতিহাসের ব্যস্ততম বছর পার করেছে। একই সাথে শ্যানন বিমানবন্দরও গত ১৬ বছরের মধ্যে তাদের সবচেয়ে সফল বছর পার করল।

আয়ারল্যান্ডের বিমান চলাচলের এই প্রবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইউরোপীয় পরিবহনের বৃহত্তর গতিপথ সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে এগোচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন ২০৫০ সালের মধ্যে ৩৫,০০০ মাইল দীর্ঘ একটি সর্ব-ইউরোপীয় দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এমনকি এই মাসেই ডেনমার্ক ও জার্মানির মধ্যে একটি ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের কাজ শুরু হয়েছে, যা কোপেনহেগেন থেকে হামবুর্গ যাওয়ার সময় তিন ঘণ্টারও বেশি কমিয়ে আনবে। কিন্তু আয়ারল্যান্ড একটি দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় এবং এর চারপাশে আটলান্টিক মহাসাগর ও আইরিশ সাগর থাকায়, ফ্রান্স বা ডেনমার্কের মতো উচ্চ-গতির রেলের মডেল অনুকরণ করা দেশটির পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে আগামী কয়েক দশক ধরে বিশ্ববাজারের সাথে যুক্ত থাকার জন্য বিমান চলাচলই হবে আয়ারল্যান্ডের একমাত্র বাস্তব মাধ্যম।

তবে ওয়াটারফোর্ডের এই ৪ লক্ষ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রাকে সম্পূর্ণ ‘আকাশকুসুম’ এবং অবাণিজ্যিক বলে বর্ণনা করেছেন বিমান সংস্থা রায়ানএয়ারের প্রধান মাইকেল ও লিয়ারি। তিনি অকপটে জানিয়েছেন, ওয়াটারফোর্ড মূলত কর্ক এবং ডাবলিন উভয় বিমানবন্দরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। তাই খরচ যদি একদম ‘বিনামূল্যে’র কাছাকাছি হয়, তবেই কেবল তিনি লন্ডনে দৈনিক এক বা দুটি ফ্লাইট চালু করার কথা বিবেচনা করতে পারেন। ফলে ৩০ মিলিয়ন ইউরোর এই বাস্তব বাজেট ও রানওয়ে নির্মাণের পর, ওয়াটারফোর্ড বিমানবন্দর অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত বিমানবন্দরের চাপ এড়িয়ে নতুন কোনো রুট ও যাত্রী আকর্ষণ করে সফল হতে পারবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: আইরিশ এক্সামিনার 

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version