দীর্ঘ ১২ বছরের টানাপোড়েন ও আলোচনার পর অবশেষে বিমান যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। নতুন এই চুক্তির অধীনে ফ্লাইট বিলম্বের ক্ষতিপূরণ এবং বিনামূল্যে হ্যান্ড লগেজ বা ছোট ব্যাগ বহনের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যাত্রীদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার জন্য এখনও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইইউ কাউন্সিলের সোমবারের এই যৌথ চুক্তির অন্যতম প্রধান দিক হলো, তিন ঘণ্টার বেশি ফ্লাইট বিলম্বের জন্য যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার। বর্তমানের এই নিয়মটি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা ইইউ কাউন্সিল সংশোধন করে চার ঘণ্টা করতে চেয়েছিল। নতুন নিয়মেও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকছে। ১,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বের ফ্লাইটের জন্য ২৫০ ইউরো, ১,৫০০ থেকে ৩,৫০০ কিলোমিটারের জন্য ৪০০ ইউরো এবং এর চেয়ে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রার জন্য ৬০০ ইউরো ক্ষতিপূরণ পাবেন যাত্রীরা। এছাড়া ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের ১৪ দিন আগে বাতিল করা হলেও যাত্রীরা এই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন।
অবশ্য ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিল যদি বিমান সংস্থার নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো ঘটনার কারণে হয়, তবে তারা এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া থেকে ছাড় পাবে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট জানিয়েছে, নতুন নিয়মে এই ধরনের ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির’ একটি নির্দিষ্ট তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়, উশৃঙ্খল যাত্রী বা আকস্মিক ধর্মঘট।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের ক্ষেত্রে বিমান সংস্থাগুলোকে ভোগান্তির শিকার যাত্রীদের কাছে কীভাবে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা পাঠাতে হবে। যাত্রা শেষ হওয়ার চার দিনের মধ্যে ইলেকট্রনিক উপায়ে (ইমেইল) এই নির্দেশনা পাঠানো বাধ্যতামূলক। যাত্রী ক্ষতিপূরণের আবেদন জমা দেওয়ার সাথে সাথেই বিমান সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্তিস্বীকার বা একনলেজমেন্ট পাঠাতে বাধ্য থাকবে এবং পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে বকেয়া ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে হবে অথবা আবেদন প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট কারণ দর্শাতে হবে।
প্রস্তাবিত নতুন নিয়মে যাত্রীদের বোর্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও বড় স্বস্তি দেওয়া হয়েছে। কোনো যাত্রী আগের কোনো ফ্লাইট মিস বা ব্যবহার না করার কারণে তাকে পরবর্তী ফ্লাইটে বোর্ডিং করতে অস্বীকৃতি জানানো যাবে না। যেমন—কেউ রাউন্ড ট্রিপের (যাওয়া-আসা) টিকিট কেটে যাওয়ার ফ্লাইটটি ব্যবহার করতে না পারলেও, তাকে ফেরার ফ্লাইটে উঠতে দিতে হবে। এছাড়া, কোনো অতিরিক্ত শুল্ক ছাড়াই বিমানে একটি ব্যক্তিগত জিনিস, যেমন একটি ছোট পার্স বা ব্যাকপ্যাক সঙ্গে রাখার অধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভাড়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এখন থেকে বিমান সংস্থা ও বুকিং পোর্টালগুলোকে শুরুতেই হাতব্যাগসহ বিমানের আসল ভাড়া প্রদর্শন করতে হবে।
শারীরিক সক্ষমতা কম ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও নতুন অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এই চুক্তিতে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে সময়মতো বোর্ডিং গেটে পৌঁছাতে না পেরে যদি তারা ফ্লাইট মিস করেন, তবে তারা বিমান সংস্থার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ, বিকল্প রুটের টিকিট এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন। এছাড়া শিশু এবং শারীরিক সক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিরা কোনো অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই তাদের সঙ্গে থাকা অভিভাবক বা সহযোগীর পাশের আসনে বসার সুযোগ পাবেন।
উল্লেখ্য, এই চুক্তিটি নিয়ে গত ১২ বছর ধরে আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য কনসিলিয়েশন কমিটির সাহায্য নিতে হয়েছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইইউ কাউন্সিল একমত হতে না পারায় ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং ২৭ জন ইউরো-মেম্বার অফ পার্লামেন্টের (এমপি) সমন্বয়ে এই অস্থায়ী কমিটি গঠন করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়।
তথ্যসূত্র: সিস নটিসিয়াস
