মঙ্গলবার, ২৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বেলগ্রেডে একটি ঐতিহাসিক সংগঠিত সভায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দশটি দেশ পোল্যান্ড, গ্রিস, স্পেন, ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, লিথুয়ানিয়া, মাল্টা, রোমানিয়া  এবং স্লোভেনিয়া একত্রে একটি বিশেষ নন‑পেপার, অনানুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেয় ইইউ’র শীর্ষ প্রশাসনিক সংস্থা ইউরোপিয়ান কমিশনের কাছে। এই নন‑পেপারটি হলো ফ্রন্টেক্স (ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূল রক্ষা সংস্থা) সংস্কারের লক্ষ্যে একটি নীতিগত রূপরেখা যা ইইউ’র অভিবাসন নীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও প্রযুক্তি‑ভিত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই দীর্ঘ এক্সটেন্ডেড রিপোর্টে আমরা ফ্রন্টেক্সের প্রেক্ষাপট, নন‑পেপার‑এর মূল দিকসমূহ, সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, ইইউ’র অভিবাসন নীতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা, প্রযুক্তি ভূমিকা, আইনি কাঠামো এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করবো।

ফ্রন্টেক্স, সম্পূর্ণ নাম ইউরোপিয়ান বর্ডার অ্যান্ড কোস্ট গার্ড বা ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূল রক্ষা সংস্থা, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইইউ’র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বাহ্যিক সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য দায়িত্বশীল। এর প্রধান কাজ হলো, ইউরোপীয় বাহ্যিক সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন প্রতিরোধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ / অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত তথ্য আদান‑প্রদান এবং মানবপাচার ও অপরাধমূলক চেকপয়েন্ট কার্যক্রমে সহায়তা।

এর আগে ফ্রন্টেক্সের দায়িত্ব তুলনামূলকভাবে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ২০১৫ সালের অভিবাসন সংকটের পর গুরুত্ব বেড়ে যায়। বিভিন্ন সীমান্তে যেসব চাপ সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে প্রবেশের সময়, তখনই ফ্রন্টেক্সের ভূমিকাকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করার দাবি উঠতে থাকে।

২০২৬ সালের নন‑পেপার‑এ সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিম্নলিখিত ধারনা ও প্রস্তাবনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমানে ফ্রন্টেক্সের দায়িত্ব অনেকক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিস্তৃত হওয়ার অভিযোগ আছে, যেমন শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়, অনেক সময় অভিবাসী পুনর্বাসন, প্রশাসনিক তদন্ত, ও ভুলভাবে সদস্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। নন‑পেপারটি দাবি করছে, ফ্রন্টেক্সের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা, তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রকে সম্মান জানিয়ে।

অর্থাৎ, ফ্রন্টেক্সকে ভুলে জাতীয় সীমান্ত বাহিনীর কাজগুলোতে হস্তক্ষেপকারী সংস্থা হিসেবে দেখার পরিবর্তে, তাকে সীমান্ত নিরাপত্তার টেকনিক্যাল ও অপারেশনাল সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। নন‑পেপারে সদস্য দেশগুলো উল্লেখ করেছে যে, ড্রোন‑ভিত্তিক সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস বিশ্লেষণ, রিয়েল‑টাইম ডেটা শেয়ারিং। এই প্রযুক্তিগুলো সীমান্ত নিরাপত্তার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, ড্রোন দিয়ে সাগর বা অনিয়ন্ত্রিত সীমানা নজরদারি করলে মানবদেহের অনিশ্চিত প্রবেশ খুব সহজেই শনাক্ত করা যাবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করলে সীমান্ত ক্রসিং প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে সম্ভব হাইব্রিড হুমকির পূর্বাভাসও পাওয়া যাবে।

একটি বড় দাবি হলো, সীমান্ত নিরাপত্তা শুধুমাত্র ইইউ’র ভিতরেই নয়, বরং তৃতীয় দেশসমূহের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন প্রতিরোধ করা উচিত। এই সহযোগিতা অর্থাৎ ইইউ’র বাহিরে অবস্থানরত দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নীতির সমন্বিত প্রয়োগ, যাতে সীমান্তে অভিবাসন চাপই সৃষ্টি না হয়।

স্ট্যান্ডিং কর্পস হচ্ছে ফ্রন্টেক্সের স্থায়ী সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। নন‑পেপারটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে দলের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও বহুজাতিক অপারেশনে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা বেশি জরুরি। এর মানে হলো শুধু সৈনিক বা নিরাপত্তা কর্মী বাড়িয়ে ফেলা নয়, বরং তাদের প্রশিক্ষণ, ভাষা দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সক্ষম করে তোলা।

নন‑পেপারটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছে, সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত হলেও মানবাধিকার, শিশু ও পরিবার সুরক্ষার নীতি অগ্রাহ্য করা যাবে না। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সীমান্ত ও অভিবাসন নীতি সাধারণত সুরক্ষা ও মানবিক দিক, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১৫‑এর অভিবাসন সংকটের পর ইইউ’র অভিবাসন নীতি কঠোর হলেও মানবিক দিক বিবেচনা করে পুরো নীতি গঠনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। ফ্রন্টেক্সকে কেন্দ্র করে নানাবিধ পরিকল্পনা ও বিতর্কের কারণগুলোর মধ্যে আছে, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন প্রবাহের চাপ বৃদ্ধি, সীমান্তে মৃত্যুর হার ও মানবিক সংকট, মানবপাচার ও অপরাধ‑সম্পর্কিত চক্র এবং মাইগ্রেশন ও প্রত্যাবাসন‑নীতি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউ’র অভিবাসন নীতি দ্বিধাগ্রস্ত, একদিকে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি, অন্যদিকে মানবিক ও শরণার্থী অধিকার। এমন অবস্থায় ফ্রন্টেক্সকে শুধু সীমান্ত রক্ষী সেকেন্ডারি সংস্থা হিসেবে না রেখে, একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও নিয়মিত অভিবাসন নীতি সংহতকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার দাবি উঠেছে।

পূর্ব ও মধ্য ইউরোপীয় দেশগুলো সাধারণত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা‑ভিত্তিক নীতির পক্ষে। তারা ফ্রন্টেক্সকে একটি কার্যকরী, নিরাপত্তা‑ভিত্তিক সংস্থা হিসেবে দেখতে চায়। আর দক্ষিণ ইউরোপীয় দেশগুলো মানবিক দিক, শরণার্থী সুরক্ষা ও অভিবাসীদের মৌলিক অধিকারে আরও জোর দিতে চায়। এই দুইটা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খোঁজা ইইউ’র জন্য এখনও কঠিন কাজ।

ইতালিতে ভিসা কোটা চলাকালীন পুরো প্রক্রিয়াটি একটি বিশেষ দিনে অনলাইনে খোলা হয়, এটাকেই বলা হয় ‘ক্লিক ডে’। এর লক্ষ্য ছিল দ্রুত আবেদন গ্রহণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবে, ব্যাকলগ বা আবেদন জট সৃষ্টি, ভুল তথ্য/দালাল ব্যবস্থার কারণে অনিয়ম ও বহু আবেদনকারী অনিশ্চিত অবস্থায় পড়া। এই বাস্তবতা পরিষ্কার করে দিচ্ছে, শুধু একটি নিরাপত্তা‑ভিত্তিক সিস্টেম যথেষ্ট নয়, বরং একটি স্বচ্ছ, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক অভিবাসন নীতির প্রয়োজন আছে।

ইউরোপীয় সীমান্ত নীতিতে সাধারণত মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন ও ন্যায্য আচরণ, এসব বিবেচনায় রাখতেই হয়। ইইউ’র সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মানবিক সুরক্ষা, শিশু ও পরিবারের নিরাপত্তা এবং নির্যাতন ও যুদ্ধজিন্ন দেশ থেকে আগতদের সুরক্ষা, এসব বিষয়ও ফ্রন্টেক্সের নীতিগত কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত।

নন‑পেপারটি মূলত এমন একটি দিকনির্দেশনা উপস্থাপন করছে যেখানে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে সঠিক ও দ্রুত তথ্য, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কিত নীতি এবং নিরাপত্তা ও অভিবাসনের ভারসাম্য, এসব মিলিয়ে একটি নতুন ইইউ‑ভিত্তিক অভিবাসন কাঠামো তৈরি করা যায়।

ফ্রন্টেক্স সংস্কারে সম্ভাব্য ফলাফল, শক্তিশালী সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার প্রতিরোধ, মানবিক ও শরণার্থী‑সম্পর্কিত আইনসম্মত ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সম্মান বজায় রাখা।

ইইউ’র অভিবাসন নীতি ও সীমান্ত নিরাপত্তায় ফ্রন্টেক্সের ভূমিকা শুধুমাত্র শীর্ষ প্রশাসনিক সংস্থার কাজ নয়, এটি এমন একটি যৌথ ব্যবহারিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র যেখানে নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন, এসব সমন্বয় করে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা তৈরি করতে হবে।

২০২৬ সালের এটি একটি মাইলস্টোন, শুধুমাত্র একটি প্রস্তাবনা নয়; বরং এটি ইইউ’র অভিবাসন নীতির পরবর্তী দশকের নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version