ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিদ্যমান ডিজিটাল আইনগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে থাকা বড় ধরনের ঘাটতি দূর করতে একটি ইউরোপীয় ডিজিটাল সংস্থা গঠন করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্রাসেলস ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত আইন ও বিধিব্যবস্থাগুলোর একটি তৈরি করেছে। তবে এসব আইন প্রয়োগের দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে থাকায় বাস্তবায়ন কার্যক্রমে বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইইউর ডিজিটাল আইনবিধির আওতায় বর্তমানে ১৭১টির বেশি আইন এবং ৩১৫টি নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক আইন ও প্রতিষ্ঠানের জটিল কাঠামোর কারণে ইইউ নিজের তৈরি করা নিয়মই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে কাঠামোগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছে বলে এক নতুন গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য জার্মানির অ্যাক্সেল ভসের দপ্তরপ্রধান কাই জেনার এবং প্রযুক্তি ও গণতন্ত্রবিষয়ক স্বাধীন বিশ্লেষক মারিয়া কুমেন গবেষণাপত্রটি লিখেছেন। এতে তারা একটি ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি বা ডিজিটাল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
গবেষণাপত্রটির লেখকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন বা এআই অ্যাক্ট, ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) এবং ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (ডিএমএ)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন বাস্তবায়ন শুরু করার এই সময়েই প্রয়োগব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার অধীনে আনা জরুরি।
মারিয়া কুমেন ইউরোনিউজকে বলেন, এআই অ্যাক্ট, ডিএসএ ও ডিএমএ বাস্তবায়নের কার্যক্রম জোরদার হচ্ছে। কিন্তু এসব আইন প্রয়োগের দায়িত্ব ৩০০টিরও বেশি ইইউ ও জাতীয় সংস্থার মধ্যে ভাগ হয়ে আছে।
তার মতে, এসব সংস্থার অনেকগুলোরই পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় দক্ষতা কিংবা স্বাধীনভাবে ও ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নেই।
কমিশনও সমস্যার অংশ
গবেষণাপত্রের লেখকদের মতে, ইইউর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আইনগুলো বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া ইউরোপীয় কমিশন নিজেও বর্তমান সমস্যার একটি অংশ।
কারণ, কমিশন একই সঙ্গে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়, আইন বাস্তবায়ন করে এবং পরে সেই ব্যবস্থার মূল্যায়নও করে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য, নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে আলোচনাও পরিচালনা করে।
ফলে ডিজিটাল আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় কমিশন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। এমনকি ভূরাজনৈতিক বা কূটনৈতিক স্বার্থের কারণে কমিশন আগেভাগেই কোনো আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও তাদের যুক্তি।
গত বছর বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নাজুক বাণিজ্য সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় গুগলের বিরুদ্ধে একটি অ্যান্টিট্রাস্ট জরিমানা বিলম্বিত করার জন্য তৎকালীন বাণিজ্য কমিশনার মারোশ শেফচোভিচ তদবির করেছিলেন।
কুমেন ও জেনারের মতে, ভূরাজনৈতিক প্রভাব, বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো, প্রভাবশালী সদস্যরাষ্ট্রগুলোর জাতীয় স্বার্থ এবং পর্যাপ্ত সম্পদের অভাব—সব মিলিয়ে ইইউতে ডিজিটাল আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।এর ফলে কাগজে-কলমে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে ইইউর অনেক ডিজিটাল আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিন ধাপে নতুন সংস্থার প্রস্তাব
ডিজিটাল আইন প্রয়োগের দায়িত্ব একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে দেওয়ার ধারণা নতুন নয়। তবে অতীতে এ ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে শক্ত বিরোধিতা ছিল।
ব্রাসেলস ও বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা ছাড়তে অনাগ্রহী ছিল। অন্যদিকে ব্যয়বহুল নতুন একটি ইইউ সংস্থা গঠনে অর্থায়ন করতেও অনেক সদস্যরাষ্ট্র আগ্রহ দেখায়নি।এই বাধা কাটিয়ে উঠতে গবেষণাপত্রে তিন ধাপে এগোনোর প্রস্তাব দিয়েছেন লেখকরা।
প্রথম ধাপে সীমিত সময়ের জন্য একটি সহযোগিতা ফোরাম গঠনের কথা বলা হয়েছে। এরপর মধ্যমেয়াদে সেটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিতে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে ইইউ চুক্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সংস্থাটিকে পুরোপুরি স্বাধীন মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এখনই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ ইউরোপীয় কমিশন ইইউর ডিজিটাল আইনগুলোর ব্যাপক পর্যালোচনা শুরু করতে যাচ্ছে। একই সময়ে ব্লকটির পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি বাজেট নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কুমেন বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে একেকটি সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে পুরো ব্যবস্থাটির কাঠামোগত সংস্কারের জন্য এখন একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এই সুযোগ হাতছাড়া হলে পরবর্তী সুযোগ আসতে আরও সাত বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
