মঙ্গলবার, ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্রিসে ছুটি কাটাতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন ২৩ বছর বয়সী পর্তুগিজ তরুণ আলভারো। একটি দ্বীপের কাছে সাগরে ডুবে যাওয়ার পর প্রায় ৮০ মিনিট ধরে চলে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা। অবশেষে চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় জ্ঞান ফেরে তার। এখন বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলছেন, এমনকি সহায়তা নিয়ে হাঁটতেও পারছেন।

ঘটনাটি ঘটে এক সপ্তাহেরও বেশি আগে। সাগরে ডুবে যাওয়ার পর আলভারো প্রায় ৪ থেকে ৫ মিনিট পানির নিচে ছিলেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ভাসিলেওস কানেলোপোলোস। ওই সময় তার জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ৭০ বছর বয়সী পর্যটক নৌকার চালক তাসোস লিকুরেসিস।

কানেলোপোলোসের মেয়ে প্রথম বিষয়টি দেখতে পান। তারা যে নৌকায় ছিলেন, তার নিচে পানিতে একজনকে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ঝাঁপ দেন লিকুরেসিস। ৮ মিটারেরও বেশি গভীরে নেমে আলভারোকে খুঁজে বের করে পানির ওপরে তুলে আনেন তিনি।

নৌকায় তোলার পর আলভারোর শরীরে কোনো পালস পাওয়া যাচ্ছিল না। চোখের মণিও প্রসারিত হয়ে গিয়েছিল। তখনই তাকে বাঁচাতে সিপিআর বা কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন শুরু করেন কানেলোপোলোস।

সাহায্য আসার অপেক্ষার পুরো সময়টাতেই চলতে থাকে তার প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা। প্রথমে আলভারোকে কোস্টগার্ডের একটি নৌযানে নেওয়া হয়। পরে আগিওস নিকোলাওস বন্দরে পৌঁছে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করা হয়। জাকিন্থোস জেনারেল হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সটি প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছায়।

কানেলোপোলোসের দল প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ মিনিট ধরে সিপিআর চালিয়ে যায়। পরে সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের দিকে আলভারোকে গ্রিসের জাতীয় জরুরি চিকিৎসা সেবা সংস্থা ইকাবের (EKAB) কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ইকাবের উদ্ধারকারীরা তার হৃদ্‌যন্ত্রে ধীর ও অনিয়মিত স্পন্দন শনাক্ত করেন। তাকে ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি ডিফিব্রিলেটর দিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় এবং বুকের ওপর চাপ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাওয়া হয়।

দুর্ঘটনার পর থেকে হাসপাতালে পৌঁছানো পর্যন্ত মোট ৭৯ মিনিট ধরে আলভারোকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলে।

হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার শ্বাসনালিতে টিউব লাগানো ছিল এবং তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখা হয়। প্রথম তিন দিন তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। তবে পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কে কোনো স্পষ্ট ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এরপর ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। গত ২৭ আগস্ট আলভারোর শ্বাসনালির টিউব খুলে দেওয়া হয় এবং জ্ঞান ফেরে তার। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন তিনি, চিকিৎসকদের সহজ নির্দেশনাও অনুসরণ করতে সক্ষম হন। পরে সহায়তা নিয়ে কয়েক পা হাঁটতেও পারেন।

আলভারো প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন।

ঘটনার পর অনেকেই কানেলোপোলোস ও লিকুরেসিসকে আলভারোর জীবন বাঁচানোর নায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে চিকিৎসক নিজে এই কৃতিত্ব নিতে চাননি।

কানেলোপোলোসের মতে, এই ঘটনার আসল নায়ক ৭০ বছর বয়সী নৌকার চালক লিকুরেসিস। কারণ কোনো ধরনের দ্বিধা না করে তিনিই প্রথম পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আলভারোকে খুঁজে বের করে ওপরে তুলে আনেন।নিজের ভূমিকা সম্পর্কে কানেলোপোলোস বলেন, ‘আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি।’

ঘটনাটিকে মানবিকতার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে এই চিকিৎসক বলেন, প্রতিদিনের নেতিবাচক খবরের ভিড়ে এমন ঘটনাও মনে করিয়ে দেয়—আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও অধ্যবসায় কখনো কখনো একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।

তার মতে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, আশা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ আপাতদৃষ্টিতে সব আশা শেষ হয়ে গেলেও কখনো কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো ফল আসতে পারে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version