রবিবার, ২৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) জরুরি পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত করার একটি প্রস্তাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং বামপন্থি ইউরোপীয় আইনপ্রণেতারা আশঙ্কা করছেন যে এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে অবৈধভাবে অভিবাসীদের ঠেলে পাঠানো বা পুশব্যাকের সুযোগ তৈরি হবে, যা তাদের সহিংসতা, নির্যাতন কিংবা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন তাঁর বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে একটি জরুরি আইনি কাঠামো চালুর প্রস্তাব করেন। গত জুলাইয়ের শেষভাগে মরক্কো থেকে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতায় একদিনে প্রায় ৮২ হাজার অভিবাসীর নজিরবিহীন প্রবেশের পর এই বিতর্কিত প্রস্তাবটি সামনে আসে। সেউতায় এখনো কয়েক হাজার অভিবাসী তাদের আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্তরে আশ্রয়ের অধিকার স্থগিত করার এমন প্রস্তাব একেবারেই নজিরবিহীন এবং এটি বিদ্যমান অভিবাসন নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। বর্তমান নিয়মানুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক যেভাবে বা যে পথেই ইউরোপে প্রবেশ করুক না কেন, তাঁর ব্যক্তিগতভাবে আশ্রয়ের আবেদন করার অধিকার রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত এই পরিবর্তন কার্যকর হলে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই সামগ্রিকভাবে অভিবাসীদের ইইউর বাইরে ঠেলে দেওয়ার বা ‘কালেক্টিভ পুশব্যাকের’ পথ খুলে যাবে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, এই ধরনের চর্চা আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফোলমেন্ট’ (কাউকে এমন জায়গায় ফেরত না পাঠানো যেখানে তাঁর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে) নীতি এবং মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ইউরোনিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর বলে, ‘অভিবাসন সংকটের সময়েও রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন আশ্রয়প্রার্থীরা প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ায় প্রবেশের সুযোগ পান এবং আন্তর্জাতিক আইনের এই গুরুত্বপূর্ণ নীতি থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

কমিশন জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতেই কেবল এই জরুরি কাঠামো ব্যবহার করা যাবে। আগামী শনিবার জার্মানির মিউনিখে ১৮টি ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য এক অভিবাসন সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা হতে পারে।

ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক দলভুক্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য সেসিলিয়া স্ত্রাদা বলেন, ‘এটি মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যবোধের আরেকটি অংশকে ধ্বংস করার শামিল।’ তিনি মনে করেন, তথাকথিত ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ হলো অবৈধ পুশব্যাককে বৈধতা দেওয়ার একটি অজুহাত মাত্র। উল্লেখ্য, অতীতে এমন পুশব্যাকের জন্য ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত গ্রিস, লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ডকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। অনথিভুক্ত অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা এনজিও ‘পিকাম’-এর পরিচালক মিশেল লেভয় বলেন, ‘এর ফলে মানুষকে এমন সব জায়গায় জোর করে ফেরত পাঠানো হবে যেখানে তারা সরাসরি সহিংসতা বা মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারে।’

অতীতে কিছু ইউরোপীয় দেশ নিজস্ব উদ্যোগে সাময়িকভাবে আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ বন্ধ রেখেছিল। ২০২০ সালের মার্চে এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে লিবিয়া থেকে নৌকার ঢল নামার পর গ্রিস তিন মাসের জন্য আশ্রয় আবেদন গ্রহণ স্থগিত করেছিল। ২০২৫ সালের মার্চে বেলারুশ থেকে আসা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে পোল্যান্ডও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তখন এর বিরোধিতা করেনি।

ফ্রন্ট-লেক্সের সহ-পরিচালক ইফতাচ কোহেন অভিযোগ করেন, উরসুলা ভন ডার লিয়েন মূলত কট্টর ডানপন্থিদের বিদেশাতঙ্ক এবং জনতুষ্টিবাদী অবস্থানেরই প্রতিধ্বনি করছেন। তবে এই কড়াকড়ির বিতর্ক এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন ২০২৩ সাল থেকেই সামগ্রিকভাবে পুরো ইউরোপজুড়ে আশ্রয়ের আবেদন এবং অবৈধ প্রবেশের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে।


শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version