রবিবার, ২রা আগস্ট, ২০২৬   |   ১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ মরক্কোর ইমসোয়েন নামক একটি উপকূলীয় শহরের সার্ফশপে কর্মরত আছেন ২৬ বছরের তরুণ হামজা (ছদ্মনাম)। কাজের ফাঁকে দোকানে বসে তিনি নিজের মোবাইল স্ক্রিনে ইনস্টাগ্রামের ফিড স্ক্রল করছিলেন। সেখানে তাঁর সামনে ভেসে উঠছিল ছোটবেলার বন্ধুদের নানা ছবি। এই বন্ধুরাই গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের দেশ স্পেনে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিলেন।

দোকানের বাইরে তখন সমুদ্রের ঢেউয়ে সার্ফশপের কাজ শেষে ক্লান্ত পর্যটকেরা ফিরছিলেন। কাছেই অবস্থিত একটি আধুনিক ও বিলাসবহুল বুটিক হোটেল, যেখানে অবস্থান করা বেশির ভাগ পর্যটকই ইউরোপ থেকে আসা অল্প বয়সী সার্ফার।

উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের অধীনস্থ সেউতা ও মেলিইয়ার ছিটমহল দুটি মূলত আফ্রিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র স্থলসীমান্ত পথ। উন্নত ও সচ্ছল জীবনের সন্ধানে আফ্রিকান অভিবাসনপ্রত্যাশীরা প্রায়শই এই কঠিন সীমানা পেরিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা চালান।

মরক্কোর অফিশিয়াল তথ্যমতে, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অন্তত ৩ হাজার মানুষ সীমানার বেড়া ডিঙিয়ে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। তবে সীমান্তরক্ষীদের হাতে তাঁরা সকলেই আটক হন। এই পুরো উদ্যোগটি আয়োজনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে পুলিশ প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করে। মরক্কো প্রশাসন এ ঘটনায় আলজেরিয়ার কয়েকজন নাগরিকের সম্পৃক্ত থাকার দাবি করলেও, আলজেরীয় সংবাদমাধ্যম সেই অভিযোগ নাকচ করে দেয়।

ওই সীমান্ত যুদ্ধের সময় মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মম আচরণের নানা ছবি ও ভিডিও নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও সরকারি তরফে এই নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। পরবর্তীতে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী তেতোয়ান শহরের সরকারি প্রসিকিউটর এই ভাইরাল ভিডিওগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি নির্দেশ জারি করেন।

গত সেপ্টেম্বর মাসে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতায় ঢোকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মরক্কোর প্রায় ৪ হাজার তরুণ এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার বেশ কয়েকজন নাগরিক সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। হামজা মূলত সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথাই বলছিলেন। ভালো জীবনযাপনের আশায় ইউরোপের পথে রওনা হওয়া সেই বিপুল জনতার ভিড়ে ছিলেন তাঁর নিজের শৈশবের ছয় বন্ধুও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেউতায় প্রবেশের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ার পর, এই তরুণেরা ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে স্প্যানিশ ছিটমহলের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত গ্রাম বেলিউনেশে এসে জড়ো হয়েছিলেন।

সেদিন সীমান্ত থেকে শত শত মানুষকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে দেওয়া হলেও, হামজার বন্ধুরা ছিলেন সেউতায় প্রবেশ করতে পারা সৌভাগ্যবান সেই হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের মধ্যে।

হামজা বলেন, ‘আমার বন্ধুরা এখন কেমন আছে, আমি জানি না। তারা খুব একটা কিছু বলে না। সম্ভবত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার ভয়ে।’ তবে এটিই প্রথমবার ছিল না। এর আগেও হামজার ছোটবেলার বন্ধুরা ইউরোপে পাড়ি জমানোর একাধিক চেষ্টা চালিয়েছেন।

বন্ধুদের তীব্র ইচ্ছাশক্তির কথা জানিয়ে হামজা বলেন, ‘স্পেনে যেতে গিয়ে আমার শৈশবের বন্ধুরা মারা যেতে পারত। তারপরও তাঁদের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়াটা সার্থক মনে হয়েছে।’ তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যেসব ছেলের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি, তাঁদের অনেকেই দারিদ্র্যের এক অন্তহীন চক্রে আটকে পড়েছেন। যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।’

এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে হামজার নিজের এলাকা এল জাদিদা থেকে ১৭ জন তরুণ স্পেনে যাওয়ার এক মারাত্মক যাত্রায় বের হয়েছিলেন। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী এই উপকূলীয় বন্দর শহরটি কাসাব্লাঙ্কার কাছেই অবস্থিত। সে সময় তাঁরা ছোট নৌকায় চড়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

তাঁর বন্ধুদের মধ্যে একজন যিনি বর্তমানে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে আছেন, তাঁর পাঠানো একটি বার্তা হামজা তাঁর মোবাইলে দেখান। হামজা বলেন, ‘ইনস্টাগ্রামে এটিই তার সর্বশেষ পোস্ট। দেখে মনে হচ্ছে সে যেন ছুটি কাটাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, স্পেনে তার জীবন মোটেও সহজ নয়।’

ইনস্টাগ্রামের ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, ফুটবলার হওয়া হামজার সেই বন্ধু সমুদ্রের পাড়ে একটি রৌদ্রোজ্জ্বল চত্বরে বসে পানীয় উপভোগ করছেন, আর পেছনে হালকা বাজছে গান। হামজা বলেন, ‘ওর প্রতিভা আছে। স্পেনে সুযোগ পাওয়ার আশায় আছে। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এখন পর্যন্ত সব ক্লাবই তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।’

গায়ে পরিপাটি আধুনিক পোশাক পরা হামজার মনে তাঁর বন্ধুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ও মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। নিজে ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর হওয়া, সচ্ছল পরিবার এবং ভালো বেতন পাওয়ার কারণে এভাবে অবৈধভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ যাওয়ার কথা হামজাকে কখনো ভাবতে হয়নি। তবে তাঁর বন্ধুরা কেন এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে, তা তিনি ভালো করেই বোঝেন।

হামজা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা দেখে ইউরোপের মানুষের জীবন কেমন। তাদের কারও কারও মনে হয়, মরক্কোতে থেকে তারা শুধু জীবনটাই নষ্ট করছে। হয়তো এটাই তাদের জন্য নতুন একটি সুযোগ।’

সেউতার ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অদ্ভুত ‘ইউরোপ–যাত্রার স্বপ্ন’ এর ট্রেন্ড বা ভাইরালের তথ্য জানান হামজা। তরুণরা সেখানে নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার গল্প শেয়ার করছিলেন। এসব ভিডিওতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছিল একটি বিশেষ শব্দ—‘হাররাগা’। উত্তর আফ্রিকার আঞ্চলিক আরবি ভাষার এই শব্দটির অর্থ হলো—আইনি ঝক্কি এড়াতে এবং পরিচয় লুকাতে অবৈধভাবে পাড়ি জমানোর আগে নিজের আসল পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলা মানুষ।

মরক্কোর অভিবাসন ও সীমান্ত গবেষক আলী জুবেইদি মিডল ইস্ট আই-কে জানান, ‘অভিবাসীদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা ছড়াতে শুরু করল, তখন আমি ভেবেছিলাম, এটি মজা। পরে বুঝলাম, বিষয়টি সত্যি।’

আলী জুবেইদির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি ২০২১ সালের সীমান্ত ভাঙার প্রচেষ্টার চেয়ে একদম ভিন্ন। ২০২১ সালে প্রায় ৮ হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। তখন কেউ সীমানার উঁচু দেয়াল টপকে, আবার কেউ বা মরক্কোর তীর থেকে সাঁতার কেটে সেউতায় পৌঁছাতে চেয়েছিলেন।

সে সময় পশ্চিম সাহারা বিরোধকে কেন্দ্র করে মাদ্রিদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে মরক্কো প্রশাসন নিজেই মানুষদের সীমান্তে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছিল স্পেন। তবে গত সেপ্টেম্বরের দৃশ্যপট ছিল আলাদা। এবার কোনো দালাল বা মানব পাচারকারীর মাধ্যম ছাড়া তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে নিজেরাই নিজেদের সংগঠিত করেছিলেন।

অতীতে সাধারণত সাব-সাহারা অঞ্চলের বিভিন্ন আফ্রিকান নাগরিকরাই এই সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু এবার সেউতার দিকে যাওয়া সিংহভাগ মানুষই ছিলেন মরক্কোর স্থানীয় নাগরিক। জুবেইদি এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সাধারণত যাঁরা অবৈধভাবে অভিবাসনের চেষ্টা করেন, তাঁরা মরক্কোর তরুণ, দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকছেন, কাজ নেই, পরিবারের সহায়তা পান না—এমন সব ব্যক্তি। কিন্তু সেপ্টেম্বরের আমরা এমন অনেককে দেখেছি, যাঁদের চাকরিবাকরি আছে ও মাসে ৪–৫ হাজার দিরহাম (প্রায় ৪৫০ মার্কিন ডলার) আয়ও করেন।’

হামজার এলাকার মানুষদের কাছে মরক্কো ছেড়ে ইউরোপে স্থায়ী হওয়াই সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। হামজা বলেন, এ অঞ্চলের যুবকদের মূল আড্ডার বিষয়ই হলো কীভাবে বাইরে যাওয়া যায়। তিনি মোবাইলের বেশ কয়েকটি পোস্ট দেখান যেখানে যারা সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপ পৌঁছেছেন, তাঁদের অভিনন্দন জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেকে দালালের খরচ মেটাতে বছরের পর বছর দিনমজুরের মতো কাজ করেছেন। এ সময় তাঁর এক বন্ধু আলাপে যোগ দিয়ে বলেন, ‘আমি এমন মানুষকে চিনি, যাঁরা মরক্কো থেকে সেউতার সাত কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অনুশীলন করেছেন।’

যারা ইউরোপে সফলভাবে ঢুকতে পেরেছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। কিন্তু হামজা বোঝেন যে, ইন্টারনেটে দেখানো চাকচিক্যের আড়ালে বাস্তবতা কতটা কঠিন। তিনি বলেন, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম দেখলে মনে হয় সবাই চমৎকার জীবন কাটাচ্ছেন, কিন্তু সেখানে তো কেউ তাঁদের রাস্তায় রাত কাটানো বা কষ্টের দিনগুলোর ছবি শেয়ার করেন না।

সেউতা সীমান্তের কাছাকাছি এমদিক-ফেনিদেক এলাকার যুবকদের জন্য ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নটা চোখের সামনেই ছিল। মরক্কোর উত্তর অঞ্চলের একটি বড় অংশ এভাবেই দেশান্তরের চেষ্টা করেছে। করোনা মহামারীর পর সীমান্ত দিয়ে কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দুই দেশের কূটনৈতিক বিরোধ বিষয়টিকে আরও সংকটে ফেলে দেয়, যার ফলে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা চরম আর্থিক মন্দার মুখে পড়েন।

সাময়িক সময়ের জন্য দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞাগুলো পরবর্তীতে ইইউ ও মরক্কোর মধ্যে বড় অংশীদারিত্বের রূপ নেয়। ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে অবৈধ অভিবাসন কমানো এবং সীমান্ত কড়াকড়ি করার বিনিময়ে মরক্কোকে ৫০ কোটি ইউরো দেওয়ার চুক্তি করে ইইউ। তবে ব্রাসেলসের এই অভিবাসন নীতিগুলো বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অভিবাসীদের ইউরোপের পথে ঢোকা রুখে দিতে ইইউ জেনেশুনেই মরক্কোর মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যায্য সুযোগ করে দিচ্ছে।

২০২২ সালের জুনে স্প্যানিশ ছিটমহল মেলিলার সীমান্তে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনাটিকে এই অমানবিক নীতির অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছিলেন। এই কঠোর সীমান্ত নীতির আসল মাসুল দিতে হচ্ছে ফেনিদেকের সাধারণ মানুষদের। আগে এই এলাকার হাজার হাজার মানুষ কাজের জন্য প্রতিদিন সেউতায় যাতায়াত করতে পারতেন। কিন্তু পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে ভয়াবহ বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে। গত পাঁচ বছরে ফেনিদেকের সাধারণ মানুষের উপার্জন প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

ফেনিদেক এলাকাতেই বড় হওয়া ১৭ বছরের শিক্ষার্থী বুশরা আবজাইউ মনে করেন, করোনাকালীন সময়ের পর তৈরি হওয়া আর্থিক হাহাকার ও হতাশা মানুষকে এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। তিনি মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, ‘মরক্কোতে তরুণদের পরিস্থিতি খুব কঠিন। আমার আশপাশে যাদের দেখি, প্রায় সবাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে।’

বুশরার নিজের ভাই ২০২১ সালের গণ-অভিবাসনের সময় মরক্কো ছেড়েছিলেন। চার বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও তিনি স্পেনে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন এবং বহু রাত তাঁকে রাস্তায় ঘুমাতে হয়েছে। তারপরও তাঁর প্রবাস জীবনের সেই গল্প বুশরার এক চাচাতো ভাইকে অনুপ্রাণিত করেছে, যিনি গত সেপ্টেম্বরে সীমানা পেরোনোর চেষ্টা করেছিলেন।

বর্তমানে সেউতার একটি কিশোর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ১৭ বছরের ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) জানায়, সে ইন্টারনেটের কোনো ডাক শুনে বা বিশেষ পরিকল্পনা করে সীমান্ত পার হয়নি। সে বলে, ‘আমি ফেনিদেকের বাসিন্দা। সীমান্তে প্রতিদিন কী হয়, আমি নিজের চোখেই দেখি। আলাদা করে আর কিছু জানার দরকার হয় না।’ তাঁর ভাষায়, ‘মরক্কো ভেঙে পড়েছে। দারিদ্র্যই আমাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছে।’

ইব্রাহিম যেদিন সাঁতরে সেউতার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল, সেদিন আকাশ ছিল বেশ কুয়াশাচ্ছন্ন। সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সেই ভয়াবহ যাত্রার কথা মনে করে সে বলে, ‘আমি ভেবেছিলাম, জীবনে এমন সুযোগ আর না–ও আসতে পারে।’ সে আরও জানায়, ‘আমার কাছে সাঁতারের কোনো সরঞ্জাম ছিল না। পথওチンতাম না। তবু সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম।’

ইব্রাহিম প্রাণে বেঁচে ফিরলেও সবাই তাঁর মতো ভাগ্যবান ছিল না। গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সাঁতরে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে কমপক্ষে ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। স্প্যানিশ শহরের উপকূলের কাছে প্রায়ই তাঁদের মৃতদেহ ভাসতে দেখা যায়।

অনেক তরুণ আবার মরক্কোর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর বাসে করে তাঁদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফেরত পাঠানো হয়। সেউতাভিত্তিক একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘নো নেম কিচেন’-এর মুখপাত্র ফ্রানচেসকা ফুসারো এই তথ্য দিয়ে জানান, গ্রেপ্তারকৃত তরুণেরা যাতে পুনরায় সীমানা পার হওয়ার চেষ্টা করতে না পারেন, সে জন্য মরক্কো প্রশাসন প্রায়ই এই কৌশল অবলম্বন করে থাকে।

ইব্রাহিম বলে, উত্তাল সাগরে কাটানো সেই সময়টুকু ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সে বলে, ‘আমার মনে হচ্ছিল, জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো মারা যাব। তখন ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম, প্রিয়জনদের কথা ভাবছিলাম। বিশেষ করে বারবার মনে পড়ছিল মায়ের কথা।’

এদিকে সেউতা সীমান্তে গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশের চেষ্টা চালান। স্থল ও সমুদ্রপথে এই নদী পারাপারের সময় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। স্পেনের সীমান্ত এলাকা থেকে এ পর্যন্ত ৫৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং মরক্কোর দিকেও বেশ কয়েকজন মারা গেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনার মতে, গত সেপ্টেম্বরে যা ঘটেছে তা কেবল সচ্ছল জীবনের আশায় দেশ ছাড়ার চেষ্টা ছিল না। তিনি বলেন, ‘এটি একধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তরুণেরা অভিবাসনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মরক্কোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।’

খালিদ মুনা উল্লেখ করেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন প্রান্তিক তরুণদের জন্য প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, সমাজে সর্বদা এক ধরনের ‘দমন-পীড়ন’ রয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এখন প্রান্তিক অঞ্চলের যুবকদের একসাথে আওয়াজ তোলার এক বড় ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে।

মরক্কোতে মানবাধিকার খর্ব করার বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ব সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কো প্রশাসন মুক্ত মত প্রকাশ ও সাধারণ সংগঠন করার অধিকারের ওপর প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করে আসছে। যার বড় প্রমাণ হলো—একাধিক প্রথম সারির সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীকে বিনাবিচারে কারাবন্দী করা এবং বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে তাঁদের হয়রানি করা।

বিশ্লেষকদের মতে, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট ও ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার কারণেই মরক্কোর তরুণরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ২০২৩ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মরক্কোর প্রায় ৬.৪ শতাংশ মানুষ (প্রায় ২৫ লাখ) চরম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কেবল আয়ের অভাব নয়, উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত।

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, করোনা মহামারীর জেরে মরক্কোর আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছেন। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার এসে দাঁড়িয়েছে ১৩.৬ শতাংশে। বুশরার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপের জীবনযাত্রার যে কাল্পনিক চিত্র তুলে ধরা হয়, তা মূলত তরুণদের বিভ্রান্ত করে বিষয়টিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। তিনি বলেন, ইউরোপে সফলভাবে ঢোকা মানুষের আড়ম্বরপূর্ণ গল্প ও অনুপ্রেরণামূলক গান প্রবাস যাত্রার প্রতি তরুণদের আগ্রহ অনেক বাড়িয়ে দেয়।

বুশরা বলেন, ‘মরক্কোর তরুণদের মধ্যে বারবার এমন চিন্তা ফিরে আসছে—এ নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন।’ এদিকে দক্ষিণ মরক্কোর একটি সার্ফশপে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন হামজা। তিনি এ বছর পড়াশোনার জন্য স্টুডেন্ট ভিসায় ইউরোপ যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তিনি বোঝেন যে, পারিবারিক সচ্ছলতা না থাকায় তাঁর বন্ধুদের সামনে এমন চমৎকার বিকল্প সুযোগগুলো নেই।

কাজের ফাঁকে হামজা আবারও তাঁর মোবাইল স্ক্রিনে বন্ধুদের খুঁজতে থাকেন। ইউরোপে অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করলেও, সামাজিক লজ্জার ভয়ে তাঁরা পরিবার বা স্বজনদের সামনে নিজেদের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে চান না এবং সুখী জীবনের কাল্পনিক ছবি তুলে ধরেন। হামজা খুব ভালো করে জানেন যে, তাঁর বন্ধুদের অনেকেই এখন ইউরোপের ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন, অথচ স্বজনদের চোখে তাঁরা ঠিকই পূরণ করে ফেলেছেন বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেই ‘ইউরোপ–যাত্রার স্বপ্ন’।

মিডল ইস্ট আই

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version