বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইউরোপের একটি ভূখণ্ড দখল বা অধিগ্রহণের ইচ্ছার কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। এবার তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ‘গ্রিনল্যান্ড’, ডেনমার্কের অধীন স্বায়ত্তশাসিত এই ভূখণ্ডটি ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের অংশ হলেও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বশক্তিগুলোর নজরে রয়েছে।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সূত্র ও মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ডকে “অপরিহার্য কৌশলগত সম্পদ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর আগেও ২০১৯ সালে তিনি প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা সে সময় ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।

সাম্প্রতিক বক্তব্যে ট্রাম্প দাবি করেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। এই মন্তব্য নতুন করে ইউরোপ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

গ্রিনল্যান্ড আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। জনসংখ্যা কম হলেও এর রয়েছে বিপুল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব। আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান রাশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি। সেখানে রয়েছে বিরল খনিজ, তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘থুলে’ এয়ার বেসও সেখানে অবস্থিত। এছাড়া, গ্রিনল্যান্ড বরফ গলতে থাকায় নতুন নৌপথ ও খনিজ উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন, তিন পরাশক্তির নজর আর্কটিক অঞ্চলের দিকে ক্রমেই বাড়ছে।

ডেনমার্ক সরকার আগের মতো এবারও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন…

গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এটি ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ, এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই ট্রাম্পের বক্তব্যকে নব্য সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় সরকার ও ইনুইট জনগোষ্ঠীও বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁদের বক্তব্য, তারা স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের পথে এগোতে চায়, কোনো পরাশক্তির “পণ্যে” পরিণত হতে রাজি নয় এবং নিজেদের ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষাই তাদের অগ্রাধিকার।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য একদিকে যেমন নির্বাচনী রাজনীতির অংশ, অন্যদিকে তেমনি এটি ভবিষ্যৎ আর্কটিক ভূরাজনীতির ইঙ্গিতও বহন করে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড দখল বা কেনা প্রায় অসম্ভব, তবে এই বক্তব্য ইউরোপ–আমেরিকা সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়াতে পারে। এছাড়া রাশিয়া ও চীন বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে আগ্রহ ইউরোপে কেবল কূটনৈতিক অস্বস্তিই নয়, বরং আর্কটিক অঞ্চলে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও বাস্তবতা বলছে, একটি ইউরোপীয় ভূখণ্ড দখল বা অধিগ্রহণের পথ রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে প্রায় বন্ধ। তবুও ট্রাম্পের এই বেপরোয়া বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের আগুন জ্বালিয়েছে, যার রেশ আগামী দিনগুলোতেও আন্তর্জাতিক আলোচনায় থেকে যাবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version