মঙ্গলবার, ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও শীর্ষ ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি ট্রেন ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্ত এলাকা অতিক্রম করার মাত্র ১৫ মিনিট পর একই রুটের আরেকটি ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলা হয়েছে।

ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইয়াহোদেন স্টেশনে হওয়া ওই হামলায় ট্রেনটির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে হামলার ১৫ মিনিট আগেই ট্রেনটির সব যাত্রীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

বরিস জনসন, যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েলসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কিয়েভে একটি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর অন্য একটি ট্রেনে একই রুট দিয়ে ফিরছিলেন। রাশিয়া দাবি করেছে, ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের ‘রেলওয়ে অবকাঠামো’ লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে কোম্পানি উক্রজালিজনিতসিয়া বলেছে, ‘খুব সম্ভবত’ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক ট্রেনটি।

হামলার সময় ইয়াহোদেন স্টেশনে থাকা আরেকটি ট্রেনের যাত্রী ছিলেন সিআইএর সাবেক প্রধান ডেভিড পেট্রিয়াস। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ঘটনাটি ‘ভয়াবহ’। তাঁর ভাষায়, এটি ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের আতঙ্কিত করার চেষ্টা করা ‘একজন সত্যিকার বর্বরোচিত নেতার’ কাজ।

উক্রজালিজনিতসিয়া জানায়, রুশ হামলার আশঙ্কায় রিয়েল-টাইম সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এ কারণে আক্রান্ত ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশন ছেড়ে যায়। এরপর রুশ জেটচালিত ড্রোন হামলার মাত্র ১৫ মিনিট আগে ট্রেনটির যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রুশ ড্রোনটি পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে আঘাত হানে।

কিয়েভের ওই সম্মেলনে অংশ নেওয়া সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ডট বিবিসিকে বলেন, হামলার পর তাঁর ট্রেনের যাত্রীদেরও ট্রেন থেকে নেমে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। পরে অবশ্য তাদের যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তাঁর ট্রেনটি শেষ পর্যন্ত পোল্যান্ডের দোরোহুস্ক সীমান্ত স্টেশনে নিরাপদে পৌঁছায়। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, বিল্ডট জনসনের একই ট্রেনে ছিলেন। তবে জনসন এ তথ্য নিশ্চিত করেননি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জনসন লিখেছেন, পোল্যান্ড সীমান্তে একটি স্থির ইউক্রেনীয় লোকোমোটিভ ধ্বংস করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে কী ধরনের ‘বিকৃত যুক্তি’ প্ররোচিত করেছে, তা তিনি জানেন না।

তিনি ঘটনাটিকে ইউক্রেনীয়দের প্রতিদিন সহ্য করা ‘এলোমেলো ও অর্থহীন হামলার’ আরেকটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কিয়েভের মিত্রদের দ্রুত ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার আহ্বান জানান।

ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে মিত্রদের কাছে দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জেটচালিত ড্রোন ঠেকাতে আরও বেশি ইন্টারসেপ্টর বা আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র চেয়ে আসছে।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ইয়াহোদেনে হামলাকে ‘বর্বর’ আখ্যা দিয়ে এটিকে পুতিনের ‘সন্ত্রাসের সরাসরি ইইউ ও ন্যাটোর দরজায় কড়া নাড়া’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি মস্কোর ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানান।

সিবিহা বলেন, পুতিনকে বুঝতে হবে যে তাঁর এই বর্বরতার জবাব এমন সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে দেওয়া হবে, যা যুদ্ধের খরচ তাঁর জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে’ নিয়ে যাবে। তাঁকে থামানোর এটিই একমাত্র উপায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। তিনি বলেন, ‘রুশ পক্ষের আগ্রাসন এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে এবং তা আমাদের সীমান্তের আরও কাছাকাছি চলে আসছে।’

বরিস জনসন ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কিয়েভে অনুষ্ঠিত ‘ইয়েস’ সম্মেলন থেকে ফিরছিলেন। রাজনীতি, ব্যবসা, নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের শীর্ষ নেতা এবং বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে ইউক্রেনের ট্রেন, রেলওয়ে ডিপো, পেট্রোল পাম্প ও সীমান্ত ক্রসিংয়ে রুশ হামলা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেন-মলদোভা সীমান্তের একটি ক্রসিংয়ে রুশ ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ ইউক্রেনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ড্রোন হামলায় এক নারী কন্ডাক্টরও নিহত হন। মাসের শুরুতে কিয়েভের একটি রেল ডিপোতে হামলায় ছয়জন রেলকর্মী নিহত হন।

এর আগে জানুয়ারিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে রুশ হামলার নিন্দা জানিয়ে জেলেনস্কি সেটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। ওই হামলায় পাঁচজন নিহত হন।

২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের আকাশপথ বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশটির বিশাল রেলওয়ে নেটওয়ার্কই কোটি কোটি মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রুশ হামলায় এই রেল যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সন্দেহজনক ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে জার্মানি দাবি করেছে, আগস্টে লাইপজিগ বিমানবন্দরে হওয়া ড্রোন হামলার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে মস্কো এ অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

এ ছাড়া ইতালি থেকে এস্তোনিয়া পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় বেশ কিছু রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার কয়েকটির জন্যও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো রাশিয়াকে দায়ী করেছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version