সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ৩০ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে চলতি বছরের আগস্ট ছিল সবচেয়ে উষ্ণ মাস। একই সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আর পশ্চিম ইউরোপ পার করেছে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মকাল।

কোপার্নিকাসের এই মূল্যায়নের পর জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তা থেকে সরে না এলে পৃথিবী এমন এক জলবায়ু পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে, যার কোনো নজির আগে দেখা যায়নি।

কোপার্নিকাসের তাপমাত্রার তথ্য ১৯৪০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে বরফের স্তর, গাছের বলয় ও প্রবালের কঙ্কালের মতো প্রাকৃতিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বর্তমান তাপমাত্রার সঙ্গে আরও দীর্ঘ সময়ের ঐতিহাসিক পরিস্থিতির তুলনা করতে পারেন।

কোপার্নিকাসের তদারককারী ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের প্রধান সামান্থা বার্গেস এএফপিকে বলেন, ‘মানুষ আজকের মতো এত উষ্ণ তাপমাত্রা দেখেনি—যুক্তিসংগতভাবে বলা যায়, অন্তত গত এক লাখ বছরে এমনটা ঘটেনি।’

কোপার্নিকাসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বিশ্বের গড় বায়ুর তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর মধ্য দিয়ে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে স্থাপিত মাসভিত্তিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডকে ০ দশমিক ০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে আগস্ট।

তবে ব্যবধান এতই সামান্য যে কোপার্নিকাস জুলাই ২০২৩ ও চলতি বছরের আগস্ট—দুই মাসকেই যৌথভাবে সর্বোচ্চ উষ্ণ মাস হিসেবে বিবেচনা করেছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর কারণে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর তীব্রতা ও সম্ভাবনা।

এদিকে ২০২৫ সালে বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখা গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

কোপার্নিকাসের প্রতিবেদন নিয়ে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেন, ‘প্রমাণ একেবারেই স্পষ্ট ও অকাট্য। এটি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর মানবজাতির নির্ভরতা এবং সেই নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের ক্রমবর্ধমান মূল্য।’

### সামনে আরও বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও আগস্টে দৈনিক হিসাবে নতুন সর্বোচ্চ রেকর্ডে পৌঁছেছে। মাসিক হিসাবেও এটি সর্বোচ্চ উষ্ণতার রেকর্ডের কাছাকাছি ছিল। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন মাস ধরে বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে রেকর্ডভাঙা উষ্ণতা অব্যাহত রয়েছে।

গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে আটকে পড়া অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্র শোষণ করেছে। এতে স্থলভাগের উষ্ণতা কিছুটা কম থাকলেও সামুদ্রিক প্রাণী, প্রবালপ্রাচীর ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে এর বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।

আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মতো জলভাগে আগের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে। একই পরিস্থিতি দেখা গেছে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরেও, যেখানে আধুনিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। এর প্রভাবে হাজার হাজার মাইল দূরের বিভিন্ন অঞ্চলেও চরম আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে পেরুর বন্যা, আফ্রিকার খরা এবং অস্ট্রেলিয়ার দাবানলও রয়েছে।

প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের উষ্ণ পর্যায় হিসেবে এল নিনোর কারণে সাধারণত বৈশ্বিক তাপমাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এমনিতেই আগের তুলনায় অনেক বেশি।

বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক মাসে তাপমাত্রার আরও রেকর্ড ভাঙতে পারে। কারণ, এই ‘অতি শক্তিশালী’ এল নিনো ডিসেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। এমনকি ২০২৭ সাল এবং সম্ভবত ২০২৬ সালও এযাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিটি এল নিনো আগেরটির চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়। আর আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো বন্ধ না করছি, ততক্ষণ রেকর্ডভাঙা এই মাসগুলো একের পর এক আসতেই থাকবে।’

কোপার্নিকাস জানিয়েছে, আগস্টের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মও শেষ হয়েছে। এই গ্রীষ্ম ২০০৩ সালে স্থাপিত দীর্ঘদিনের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়টি একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহে চিহ্নিত ছিল। এসব তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছে, নদী শুকিয়ে গেছে এবং ভূমি ভয়াবহ দাবানলের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইউরোপের তাপজনিত মৃত্যুর ওপর নজর রাখা পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ইউরোমোমোর হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে অতিরিক্ত তাপের কারণে ৩২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া আরোপণ নেটওয়ার্কের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব না থাকলে জুনে আঘাত হানা বিশেষভাবে শক্তিশালী ওই তাপপ্রবাহ ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল।

শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও অস্বাভাবিক তীব্র গরম অনুভূত হয়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সংলগ্ন যুক্তরাষ্ট্রও এযাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মকাল পার করেছে।

এএফপির কোপার্নিকাসের উপাত্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯০ কোটি মানুষের বসবাসকারী এলাকাগুলোতে এযাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই পার হয়েছে।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের সমুদ্রবিজ্ঞানী ও কৌশলগত প্রধান সামান্থা বার্জেস বলেন, ‘আমরা একটি ব্যতিক্রমী গ্রীষ্মকাল দেখেছি। শুধু ইউরোপেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য অংশেও প্রায় এক শতাব্দী ধরে টিকে থাকা রেকর্ডগুলো ভেঙে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বন্ধ না করা পর্যন্ত জলবায়ু পরিস্থিতি আরও চরম হয়ে উঠতে থাকবে।’


শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version