বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গত এক বছরে ফ্রান্সে অভিবাসন পরিস্থিতি আরও কঠোর রূপ নিয়েছে। অনিয়মিত অভিবাসীদের জোরপূর্বক বহিষ্কারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে নিয়মিত বা বৈধ হওয়ার সুযোগ। ২০২৫ সালের অভিবাসন সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ফ্রান্সের বিদেশি নাগরিক বিষয়ক দপ্তর-ডিজিইএফ, যা দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্থা।

বহিষ্কারে রেকর্ড বৃদ্ধি

ডিজিইএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফ্রান্স থেকে অন্তত ১৫ হাজার ৫৬৯ জন অনিয়মিত বিদেশিকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৮০০ এবং ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৭০০। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জোরপূর্বক বহিষ্কার বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। সব ধরনের বহিষ্কার, জোরপূর্বক, সহায়তাপ্রাপ্ত ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন, মিলিয়ে ২০২৫ সালে মোট ২৪ হাজার ৯৮৫ জন বিদেশিকে ফ্রান্স ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। গত সপ্তাহে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর প্লাস বোভোতে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনেও এসব তথ্যের একটি অংশ প্রকাশ করা হয়েছিল।

উত্তর আফ্রিকার পশ্চিমাংশের নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত

পরিসংখ্যান বলছে, বহিষ্কারের ক্ষেত্রে শীর্ষ তিন জাতীয়তা হলো, আলজেরীয় প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন, মরক্কোর নাগরিক প্রায় ২ হাজার ও টিউনিশীয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। মরক্কোর নাগরিকদের ক্ষেত্রে বহিষ্কার বেড়েছে ২১ শতাংশ, টিউনিশীয়দের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ। তবে তুলনামূলকভাবে আলজেরীয় নাগরিকদের জোরপূর্বক বহিষ্কার ১৫ শতাংশ কমেছে। ডিজিইএফ জানিয়েছে, চারজন বহিষ্কৃত বিদেশির মধ্যে একজন মাগরেব অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিক।

এছাড়া ২০২৫ সালে নতুন করে তালিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে আফ্রিকার গিনি ও মিসর। এ বছর গিনিতে ফেরত পাঠানো হয়েছে ৬৬৬ জন এবং মিসরে ৬৩৩ জন। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ৮৪ শতাংশ ও ১৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আলজেরীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক জটিলতা

ডিজিইএফের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান গিয়োম মর্দ জানান, ২০২৫ সালে বহিষ্কৃত আলজেরীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে সহায়তাপ্রাপ্ত ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন বেড়েছে। তবে জোরপূর্বক বহিষ্কার কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আলজেরীয় কর্তৃপক্ষের কনস্যুলার পাস দিতে অনীহা। পরিচয়পত্র না থাকলে এই অনুমতিপত্র ছাড়া কাউকে আলজেরিয়ায় ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। ডিজিইএফের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বসবাসরত সবচেয়ে বড় আলজেরীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে ফ্রান্সে, যার একটি বড় অংশ অনিয়মিত অবস্থায় বসবাস করছে।

বোর্দো-মোঁতাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলজেরিয়া বিশেষজ্ঞ গবেষক কিন্দা বেন ইয়াহিয়া ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ফ্রান্স ছাড়ার বাধ্যবাধকতা পাওয়া ব্যক্তিদের ঘিরেই মূলত এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্যারিস দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আলজেরিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে কনস্যুলার অনুমতিপত্র দিতে দেরি করছে বা অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি অভিবাসন ইস্যুকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

গ্রেপ্তার বেড়েছে, বৈধতা কমেছে

২০২৫ সালে অনিয়মিত অভিবাসীদের গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়েছে ৩০ শতাংশ। মোট গ্রেপ্তার হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ১৪০ জন, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৬১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশই আলজেরীয় নাগরিক। অন্যান্য মাগরেব দেশের নাগরিকদের যুক্ত করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪ হাজারের বেশি, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় ৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে, ব্যতিক্রমী উপায়ে বৈধতা পেয়েছেন মাত্র ২৮ হাজার ৬১০ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ কম।

গিয়োম মর্দ বলেন, রোতাইয়ো সার্কুলারের প্রভাব এখানে স্পষ্ট। এই সার্কুলারে বৈধতাকে আবারও ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে জোর দেওয়া হয়েছে এবং শর্ত আরও কঠোর করা হয়েছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ব্যতিক্রমী উপায়ে বসবাসের বৈধতা পেতে হলে, ফ্রান্সে অন্তত ৭ বছর বসবাসের প্রমাণ, শেষ দুই বছরে কমপক্ষে ১২ মাস কাজ করার প্রমাণ দেখাতে হয়। এরআগে কিছু ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ছিল পাঁচ বা তিন বছর।

শিক্ষার্থী ও কর্মসংস্থানভিত্তিক বৈধতায় বড় ধস

২০২৫ সালে চাকরির ভিত্তিতে ব্যতিক্রমী উপায়ে বসবাসের বৈধতা কমেছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।পারিবারিক কারণে কমেছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বৈধতা কমেছে ৮২ শতাংশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে বৈধকরণ ৪২ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল

রেসিডেন্স পারমিট বেড়েছে, তবে ভারসাম্য বদলেছে

সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ২০২৫ সালে ফ্রান্স প্রথমবারের মতো ৩ লাখ ৮৪ হাজার ২৩০টি রেসিডেন্স পারমিট দিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে, শিক্ষার্থী ভিসা ১ লাখ ১৮ হাজার, মানবিক কারণে রেসিডেন্স পারমিট ৯২ হাজার ৬০০ (৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি) যার মধ্যে শরণার্থী মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত। তবে অর্থনৈতিক কারণে দেওয়া রেসিডেন্স পারমিট ১২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজারে।

গিয়োম মর্দের মতে, চাকরির বাজার হয়তো আগের মতো বিদেশি শ্রমিক আকর্ষণ করছে না। বিশেষ করে ২০২৫ সালে মজুরির ক্ষেত্রে সেই গতি আর দেখা যায়নি।সার্বিকভাবে বলা যায়, ফ্রান্সে অভিবাসন নীতিতে নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি বেড়েছে, বিশেষ করে অনিয়মিত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে। বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার বৃদ্ধির বিপরীতে নিয়মিত হওয়ার পথ সংকুচিত হওয়ায় হাজারো অভিবাসীর জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। মানবিক সহায়তা ও শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু সুযোগ থাকলেও, কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসনের ভবিষ্যৎ আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version