শুক্রবার, ৬ই নভেম্বর, ২০২৬   |   ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সজুড়ে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বড় ধরনের বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকর্মী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন খাতের কর্মীরা। এতে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিক্ষোভে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতের কর্মী, আকাশপথ নিয়ন্ত্রণকর্মী, রেল ও বন্দর শ্রমিক এবং ডাক বিভাগের কর্মীরাও যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের ২০২৭ সালের বাজেট বিলের প্রথম অংশ পার্লামেন্টে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার এক দিন পর এ বিক্ষোভ হচ্ছে। বুধবার দলমত নির্বিশেষে ঐকমত্যের ভিত্তিতে আইনপ্রণেতারা বাজেটের প্রথম অংশের বিপক্ষে ভোট দেন। সরকারের মূল বাজেট প্রস্তাবটি এখন সিনেটে যাবে। আগামী ৯ ডিসেম্বর সেখানে এ বিষয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

এরপর পার্লামেন্টের একটি কমিটি বিলটি নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করবে। পরে এটি আবার জাতীয় পরিষদে পাঠানো হবে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ফ্রান্সে বিক্ষোভ চলছে। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষে জায়গার সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে সমস্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে আন্দোলনের পরিধি বাড়ে। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোও রাস্তায় নামে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেও তারা বিক্ষোভ করছে।

বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভ ঘিরে দেশজুড়ে ৭০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তিনি বলেন, বিক্ষোভ যেন শান্তিপূর্ণভাবে এবং কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করাই নিরাপত্তা বাহিনীর ‘প্রধান দায়িত্ব’।

তিনি আরও জানান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উগ্র বামপন্থী আন্দোলন ও সহিংস বিক্ষোভকারী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের বিষয়টি শনাক্ত করেছে। এসব গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হতে পারে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি, অনুমোদনহীন মিছিল আয়োজন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি ভবনে লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো।

প্যারিসে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাবিত বিক্ষোভের রুটে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। এর পরিবর্তে বিকল্প একটি রুটে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের সহিংসতার পর সরকার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই সময় মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

তবে শ্রমিক সংগঠন ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ‘কর্তৃত্ববাদী’ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ফরাসি পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে।

বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত
আগামী এপ্রিলে নির্বাচন হতে আর ছয় মাসেরও কম সময় বাকি। এর মধ্যেই ঝুলন্ত পার্লামেন্টে নিজেদের ২০২৭ সালের বাজেট পাস করানোর চেষ্টা করছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার। বিপুল সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতির সংকট মোকাবিলায় প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পদক্ষেপ রাখা হয়েছে।

বর্তমানে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি পার্টির মেরিন লে পেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন কট্টর বামপন্থী ফ্রান্স আনবোড পার্টির নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ।

ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আর্থিক বাজারগুলোতে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপও রয়েছে। অন্যদিকে দেশটির প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো বাজেটের তীব্র সমালোচনা করেছে।

বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেট সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর চাপ বাড়াবে, সামাজিক সুবিধা স্থগিত করবে এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সুরক্ষামূলক ভূমিকা দুর্বল করবে। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ অক্টোবর শিক্ষা খাতে বেশ কিছু সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করে ফরাসি সরকার। এর মধ্যে স্কুল সংস্কারে স্বল্প সুদে ৪০০ কোটি ইউরো ঋণ এবং ২০২৭ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার আসন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো এসব পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করছে। তাদের ভাষায়, এসব উদ্যোগ মূলত লোকদেখানো। স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়নে সরাসরি ১ হাজার কোটি ইউরো বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছে তারা। কিছু সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ২ লাখ ৫০ হাজার আসন তৈরিরও দাবি জানিয়েছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানির দাম বেড়ে ফ্রান্সেও জনঅসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে। বাড়তি ব্যয়ের মুখে থাকা পরিবারগুলোর ওপর চাপের মধ্যে জ্বালানি কোম্পানিগুলোর রেকর্ড মুনাফা নিয়েও সমালোচনা করেছেন ফরাসি আইনপ্রণেতারা।

গত ১ নভেম্বর কৌশলগত মজুত থেকে ১ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়তে শুরু করে ফরাসি সরকার। এরপর দেশজুড়ে হাজারো পেট্রল পাম্পে জ্বালানির দাম কমেছে বলে জানায় সরকার।
বুধবার সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশটির অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউ বলেন, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম গড়ে ১৫ সেন্ট কমেছে। ৩ হাজারের বেশি পেট্রল পাম্পে এ দাম কমার পরিমাণ ২০ সেন্টে পৌঁছেছে।

ফরাসি পেট্রোলিয়াম শিল্প ও গতিশীলতা ইউনিয়নের (ইউএফআইপি) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১০ হাজারের বেশি পেট্রল পাম্প রয়েছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version