বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২৬   |   ৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গত সপ্তাহান্তে রাস্তায় নামেন লাখো মানুষ। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় অদ্ভুত এক স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।

ইসলামি অভিব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহ’র অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। অন্যদিকে, ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’র অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্রণে তৈরি এই বাক্যাংশের সরল কোনো অর্থ নেই। তবে ফ্রান্সের তরুণদের কাছে এটি পুলিশি নজরদারি, কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস এবং বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে ব্যঙ্গ করার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবসহ বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। গত সপ্তাহান্তে সেই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা দেখা দেয়।

যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে স্লোগানটি

ধারণা করা হয়, স্লোগানটির শুরু স্ন্যাপচ্যাটে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের আয়োজকেরা একটি ব্যক্তিগত চ্যাটরুমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেন। সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে এক ব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যাংশটি ব্যবহার করেন।

স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে পাঠানো বার্তায় তিনি লেখেন, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। এরপর লেখেন, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব’।

ধারণা করা হচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন প্রোফাইল ব্যবহার করে একই ধরনের বার্তা একাধিকবার পাঠানো হয়েছিল। এসব প্রোফাইলে মামাদু ও আবদেল্লাহর মতো নাম ছিল। কয়েকটি অ্যাকাউন্টে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজিও দেখা যায়।

বার্তাগুলো অন্য ব্যবহারকারীদের কাছে হাস্যরসাত্মক মনে হয়। তাঁরা সেগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস নিশ্চিত করা যায়নি।

কী ঘটেছিল এরপর?

অনেক তরুণের ধারণা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাঁদের মতে, আলোচিত বার্তাগুলো ছিল আন্দোলনের ওপর নজরদারি চালানোর একটি অপরিণত প্রচেষ্টা।

বিক্ষোভকারীরা দ্রুত ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি গ্রহণ করেন। আন্দোলনে নজরদারি এবং তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করতে তাঁরা এটি ব্যবহার করতে শুরু করেন।

একপর্যায়ে স্লোগানটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের বিষয়টি এতে উঠে আসে।

ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তান, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ তাঁদের ভুল বোঝে এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আলোচিত বার্তাগুলোতেও সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সদস্য এই বাক্যাংশ ব্যবহার করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় মন্তব্য করেনি। তবে বিক্ষোভের সময় বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কখনো কখনো অনলাইনে ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করেন বলে স্বীকার করেছে মন্ত্রণালয়।

এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তদন্তকারীরা ছদ্মনাম ব্যবহার করতে পারেন। এর মাধ্যমে তাঁরা অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় এসব তথ্য প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

স্লোগানটি কেন এত আলোড়ন তুলেছে?

শিক্ষার্থীদের কাছে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি সরকার ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দূরত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকার তাঁদের দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ফ্রান্সের একটি প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ বলেন, ‘কোনো তরুণ এভাবে কথা বলে না।’

তাঁর মতে, তরুণেরা এখন স্লোগানটি ব্যবহার করে পুলিশের নজরদারি এবং আন্দোলনে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা বোঝাতে চাইছেন, এসব চেষ্টা সত্ত্বেও নিজেদের সংগঠিত করার সক্ষমতা তাঁদের রয়েছে।

বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদিও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তাঁর মতে, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলোতে পুলিশের এক ধরনের পূর্বধারণা প্রকাশ পেয়েছে। পুলিশ মনে করেছিল, নির্দিষ্ট কিছু মানুষ অবরোধ তৈরি করছেন অথবা ‘সবকিছু ভেঙে ফেলার’ পরিকল্পনা করছেন।

প্যারিসের শিক্ষার্থী ফেদ্র কেমেনের বলেন, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এখন ফ্রান্সজুড়ে রসিকতার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, এতে তরুণদের কথা বলার ধরন অনুকরণের চেষ্টা করা হয়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

তিনি আরও বলেন, ‘এটিকে বর্ণবাদের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যারা সম্পত্তি ভাঙচুর করবে, তারা আরব।’

ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়েছে স্লোগানটি

‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি বেলজিয়াম ও জার্মানিতে একই ধরনের বিক্ষোভেও ব্যবহৃত হয়েছে।

সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রকাশিত একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে স্লোগানটি বলেন। ভিডিওতে তাঁকে তরুণ প্রজন্মের আরও কিছু অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়। এর মধ্যে ‘৬-৭’ নামের একটি মিমের সঙ্গে সম্পর্কিত অঙ্গভঙ্গিও ছিল। অদ্ভুত ও অর্থহীন উপস্থাপনার কারণে মিমটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

স্লোগানটির ব্যবহার ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলনের’ কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। সেখানেও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণ ও বেকারদের ‘পরজীবী’ ও ‘ককরোচ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা নিজেদের আন্দোলনের নাম দেন ‘ককরোচ আন্দোলন’। অপমানসূচক শব্দটিকেই তাঁরা প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

যেভাবে শুরু হয় বিক্ষোভ

গত মাসে ফ্রান্সের শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার, আরও শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং ব্যস্ততাপূর্ণ সময়সূচি সহজ করার দাবিতে তাঁরা আন্দোলনে নামেন।

অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা অন্তত ২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেন বা ভাঙচুর চালান। এসব ঘটনায় প্রায় ৮ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য সংগঠনের কর্মসূচি যুক্ত হয়। এতে গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তবে ব্যাপক দাঙ্গা ও সহিংসতার কারণে শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো আড়ালে পড়ে যায়।

পুলিশের কঠোর পদক্ষেপও বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। গত মাস থেকে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অন্তত ৩৪টি অভিযোগ তদন্ত করছে ফ্রান্সের সরকারি পুলিশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা।

এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড কাছ থেকে আঘাত করায় কিশোরটি গুরুতর আহত হয়।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version