বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিয়ে মানেই যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্যবাধকতা, এই শতাব্দীপ্রাচীন ধারণার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে ফ্রান্স। তথাকথিত ‘দাম্পত্য অধিকার’ ধারণাকে আইনি কাঠামো থেকে কার্যত বাতিল করার লক্ষ্যে ফরাসি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করেছে। বুধবার গৃহীত এই আইনের মাধ্যমে ফ্রান্সের সিভিল কোডে যুক্ত হয়েছে নতুন ধারা, যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, একসঙ্গে বসবাস মানে যৌন সম্পর্কের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়। এই সিদ্ধান্তকে ফ্রান্সে বিবাহ, সম্মতি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখছেন আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা।

নতুন আইনে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। একটি হলো, বিয়ে বা একসঙ্গে বসবাস যৌন সম্পর্কের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। অন্যটি, যৌন সম্পর্কের অভাবকে ডিভোর্স বা বিচ্ছেদের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না, বিশেষ করে দোষ-ভিত্তিক বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো স্বামী বা স্ত্রী যৌন সম্পর্ক না পাওয়াকে আইনি ‘অপরাধ’ বা দাম্পত্য দায়িত্ব লঙ্ঘন হিসেবে আদালতে তুলে ধরতে পারবেন না।

যদিও ফরাসি সিভিল কোডে কখনোই সরাসরি ‘যৌন কর্তব্য’ শব্দটি উল্লেখ ছিল না, তবে আইনের ব্যাখ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছিল। কোডে বলা আছে, দম্পতিরা একে অপরকে সম্মান করবেন, বিশ্বস্ত থাকবেন, সহায়তা করবেন এবং একসঙ্গে বসবাস-এর প্রতিশ্রুতি দেবেন। এই একসঙ্গে বসবাস ধারণার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বহু ক্ষেত্রে বিচারকরা যৌন সম্পর্ককেও এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই ব্যাখ্যার শিকড় পাওয়া যায় মধ্যযুগীয় গির্জার আইনে, যেখানে বিয়েকে মূলত যৌন সম্পর্ক ও বংশবিস্তারের চুক্তি হিসেবে দেখা হতো।

২০১৯ সালের একটি আলোচিত মামলা এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনে। ওই মামলায় এক নারী কয়েক বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে অস্বীকৃতি জানান। ফরাসি আদালত তখন স্বামীকে দোষ-ভিত্তিক বিচ্ছেদ মঞ্জুর করে, কার্যত স্ত্রীর ওপর দায় চাপিয়ে। ওই নারী পরে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে আবেদন করেন। ২০২৩ সালে আদালত ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে জানায়, যৌন সম্পর্ক করতে না চাওয়া কোনোভাবেই ‘দোষ’ হতে পারে না এবং এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

এই রায়ের পর ফরাসি বিচার ব্যবস্থায় ‘যৌন কর্তব্য’ ধারণা ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। নতুন আইনটি মূলত সেই আইনি অবস্থানকে পরিষ্কার ও আনুষ্ঠানিক রূপ দিল। বিলটির স্পনসর গ্রিন পার্টির এমপি মারি-শার্লট গ্যারিন বলেন,

“এই ধরনের তথাকথিত অধিকার বা কর্তব্য বজায় রাখার মানে হলো আমরা স্বামীর আধিপত্য ও নির্যাতনকে বৈধতা দিচ্ছি। বিয়ে এমন কোনো গণ্ডি হতে পারে না, যেখানে একবার সম্মতি দিলেই তা সারাজীবনের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।”

নারীবাদী সংগঠনগুলোর মতে, এই আইন বৈবাহিক ধর্ষণ প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো ফ্রান্সেও এখন বৈবাহিক ধর্ষণ একটি অপরাধ। তবে ১৯৯০ সালের আগে পর্যন্ত ফ্রান্সে পুরুষরা আইনি ভাবে দাবি করতে পারত, বিয়ে মানেই স্ত্রীর সম্মতি।

এই মানসিকতার ভয়াবহ পরিণতি সামনে আসে ২০২৪ সালের আলোচিত ‘মাজান ট্রায়াল’-এ। সেখানে জিসেল পেলিকট নামের এক নারীকে তার স্বামী নিয়মিতভাবে মাদক দিয়ে অচেতন করতেন। এরপর স্বামীর আমন্ত্রণে আসা বিভিন্ন পুরুষ তাকে ধর্ষণ করত। আদালতে অনেক আসামিই দাবি করে, স্বামীর সম্মতি থাকায় তারা ভেবেছিল স্ত্রীরও সম্মতি রয়েছে। এই মামলাটি ফরাসি সমাজে ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং ‘সম্মতি’ ধারণা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ফ্রান্সে ধর্ষণের আইনি সংজ্ঞাও সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন ধর্ষণ বলতে শুধু সহিংসতা, হুমকি বা জোরজবরদস্তিই নয়, বরং যেখানে স্পষ্ট, জানাশোনা, নির্দিষ্ট এবং যেকোনো সময় প্রত্যাহারযোগ্য সম্মতি নেই, সেটিই ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে। আইন পরিষ্কারভাবে বলছে, নীরব থাকা বা কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানো সম্মতি নয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন ধারা আদালতের রায়ে হয়তো নাটকীয় পরিবর্তন আনবে না, তবে এর প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। এটি সমাজকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, বিয়ে কোনো যৌন লাইসেন্স নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও স্বাধীনতার সম্পর্ক।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের অন্যান্য দেশেও দাম্পত্য, সম্মতি ও যৌন অধিকার নিয়ে নতুন আইনি বিতর্কের সূচনা করতে পারে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version