বৃহস্পতিবার, ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ৩০ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে না দিলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক আরোপের হুমকির বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় অবস্থান নিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন হুমকিকে সরাসরি ভয়ভীতি ও দাদাগিরি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, ইউরোপ কখনোই গুণ্ডামির কাছে মাথা নত করবে না।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) মঞ্চ থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে মাক্রোঁ বলেন, আটলান্টিকের দুই পাড়ের মধ্যে উত্তেজনা এড়াতে ইউরোপের অনেক নেতা যখন সতর্ক ভাষা বেছে নিচ্ছেন, তখন ফ্রান্স ও ইউরোপ স্পষ্ট করে নিজেদের অবস্থান জানাতে বাধ্য। তাঁর ভাষায়, শক্তির জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়ম আমরা মানব না। তা মেনে নিলে ইউরোপ ধীরে ধীরে পরাধীনতার দিকে চলে যাবে।

মাক্রোঁ বলেন, বিশ্ব রাজনীতি যদি নীতিহীনতার দিকে ধাবিতও হয়, ইউরোপ ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গুণ্ডামির বদলে সম্মান এবং বর্বরতার বদলে আইনের শাসন, এই মূল্যবোধই ইউরোপ লালন করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে মাক্রোঁ শুধু ট্রাম্পের শুল্ক-হুমকির জবাবই দেননি, বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক লালরেখাও টেনে দিলেন। ডব্লিউইএফের মঞ্চে বক্তৃতার সময় মাক্রোঁর চোখে এভিয়েটর সানগ্লাসও আলোচনার জন্ম দেয়। পরে এলিসি প্রাসাদ জানায়, চোখের রক্তনালী ফেটে যাওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে সুরক্ষার জন্য তিনি চশমাটি ব্যবহার করছেন।

ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার প্রেক্ষাপটেই দাভোসে এই বক্তব্য দেন মাক্রোঁ। এর আগে ট্রাম্প কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে মাক্রোঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তার স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ওই বার্তায় গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে একটি জি-৭ বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। এরআগে গত শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানানো পর্যন্ত ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় মিত্র দেশের পণ্যের ওপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুল্ক আরোপ করা হবে। ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো এই পদক্ষেপকে সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখছে।

দাভোসে মাক্রোঁ বলেন, ওয়াশিংটনের একের পর এক শুল্ক আরোপ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, বিশেষ করে যখন তা ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে ট্রাম্প যে ব্যক্তিগত বার্তাটি প্রকাশ করেছেন, তাতে মাক্রোঁ তাঁকে বৃহস্পতিবার প্যারিস সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের এই টানাপোড়েন শুধু একটি ভূখণ্ডগত ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক আইন এবং পশ্চিমা মিত্রদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশক হয়ে উঠছে। দাভোসের মঞ্চ থেকে মাক্রোঁর কড়া বক্তব্য সেই বৃহত্তর সংঘাতেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version