বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা অভিবাসীদের ঠেকাতে ফরাসি নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফ্রান্সের স্বাধীন অধিকার রক্ষক সংস্থা-ডিডিডি সংস্থাটি বলেছে, বহু ক্ষেত্রে এই অস্ত্র প্রয়োগ প্রচলিত আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তা করা হচ্ছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে।

ফ্রান্সে নাগরিক ও মানবাধিকার তদারকির দায়িত্বে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি একটি স্বাধীন প্রশাসনিক সরকারি কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির প্রধান ক্লেয়ার হেদোঁ ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর দেওয়া এক সিদ্ধান্তে এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন। ওই সিদ্ধান্তটি আসে প্রায় ৪০টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তদন্তের পর, যার অধিকাংশই দায়ের করেছিল অভিবাসী সহায়তাকারী সংগঠন ইতুপিয়া ৫৬।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সের উত্তর উপকূলের সৈকতগুলোতে নিয়মিতভাবে এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করা অভিবাসীদের ঠেকাতে পুলিশ তথাকথিত ‘মধ্যম মাত্রার শক্তি প্রয়োগ’ করছে। এর আওতায় ব্যবহৃত হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শক পিস্তল, ডিফেন্স বল লঞ্চার, এবং কাঁদানে গ্যাস। তদন্ত শেষে ডিডিডি মনে করছে, এসব অস্ত্রের ব্যবহার প্রায়ই বিচারবোধের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করছে এবং “অবশ্যই প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক” ব্যবহারের আইনি নীতির পরিপন্থি হচ্ছে।

অধিকার রক্ষক ক্লেয়ার হেদোঁ বলেন, যেসব ঘটনায় বৈধ আত্মরক্ষার যুক্তি দেখানো হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা বাহিনী তাদের দাবি করা হামলার বাস্তবতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারেনি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বহু ঘটনায় কোনো ভিডিও ফুটেজ নেই, লিখিত প্রতিবেদনে স্পষ্টতার অভাব রয়েছে এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কখনো কখনো পুলিশ এমন পরিস্থিতিতেও অস্ত্র ব্যবহার করছে, যেখানে স্পষ্ট ঝুঁকি ছিল না, যেমন রাতে, লক্ষ্যবস্তু থেকে দূরে অবস্থান করা অবস্থায় অথবা ঘন ও চলমান জনসমষ্টির মুখে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া। ডিডিডি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, এসব অস্ত্র বৈধ আত্মরক্ষার মতো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য হলেও, তা বিশেষ করে শিশু, নারী ও শারীরিকভাবে দুর্বল অভিবাসীদের জন্য গুরুতর শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ক্লেয়ার হেদোঁ জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো প্রতিক্রিয়া অবশ্যই আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকতে হবে এবং তা হতে হবে একেবারে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক। তিনি আরও সুপারিশ করেন, ‘মধ্যম মাত্রার শক্তি প্রয়োগ’-এর আওতায় অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিটি ঘটনায় লিখিত রিপোর্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং পুলিশ সদস্যদের মনে করিয়ে দিতে হবে, প্রতিটি ঘটনা সঠিক ও নির্ভুলভাবে নথিভুক্ত করা তাদের দায়িত্ব।

প্রতিবেদনে চ্যানেলে অভিবাসীদের নৌকা ধ্বংসের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এটি করা হচ্ছে নৌকায় ওঠা ব্যক্তিদের জীবন ঝুঁকি থেকে রক্ষার জন্য। তবে ডিডিডির মতে, এই ধরনের হস্তক্ষেপের জন্য এখনো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন নেই। প্রতিবেদনের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে নৌকায় উঠতে বাধা দিতে, তাদের ছত্রভঙ্গ করতে বা সমুদ্র থেকে দূরে সরিয়ে দিতেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বৈধ আত্মরক্ষা বা জনশৃঙ্খলা রক্ষার আওতায় পড়ে না। এ কারণে সংস্থাটি সুপারিশ করেছে, নৌকা ধ্বংসের যৌক্তিকতা নির্ধারণে স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ ও শুধুমাত্র নৌকায় ওঠা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।

এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে ইংলিশ চ্যানেলে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন চাপ। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান ৩৬ হাজার ৫৬৬ জন এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৪৭২ জনে। এটি ২০২২ সালের ৪৫ হাজার ৭৭৪ জনের রেকর্ডের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা এবং ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি। যদিও এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে বহুল আলোচিত ‘একজনের বদলে একজন’ চুক্তি কার্যকর হয়েছে।

ডিডিডির প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে, চ্যানেল সংকট শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি একটি গভীর মানবাধিকার প্রশ্ন। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নামে যদি আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তবে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফরাসি সরকারের অবস্থান এবং নিরাপত্তা নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকে এখন তাকিয়ে ইউরোপজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসন পর্যবেক্ষকরা।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version