মঙ্গলবার, ২৫ই আগস্ট, ২০২৬   |   ১০ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সের আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন মধ্য-বামপন্থী দল ‘প্লেস পাবলিক’-এর প্রধান, সাবেক প্রাবন্ধিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য রাফায়েল গ্লুকসম্যান। রোববার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে বামপন্থী শিবিরের একাধিক প্রার্থীর তালিকায় যুক্ত হলেন ৪৬ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ।

এর আগে গত ২৬ মে টিএফওয়ান টিভি চ্যানেলেই গ্লুকসম্যান ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি নিজেকে তিন মাস সময় দিচ্ছেন ‘সারা দেশ চষে বেড়াতে’, ‘একটি নতুন দেশপ্রেমিক চুক্তি প্রস্তাব করতে’ এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ‘নিজের রাজনৈতিক পরিবারকে পুনর্গঠিত করতে’।

গ্লুকসম্যানের এই ঘোষণা অবশ্য অপ্রত্যাশিত ছিল না, তবে তাঁর এই সিদ্ধান্তের ফলে একটি বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে গণমাধ্যম জগতে। গ্লুকসম্যানের জীবনসঙ্গী তথা ফ্রান্সের শীর্ষ পাবলিক চ্যানেল ‘ফ্রান্স ২’-এর প্রধান সংবাদ উপস্থাপক ও খ্যাতনামা সাংবাদিক লিয়া সালামে নির্বাচন চলাকালীন ‘স্বার্থের সংঘাত’ এড়াতে তাঁর পেশা থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সালামে ইতিমধ্যেই জানিয়েছিলেন যে, তাঁর সঙ্গী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়লে তিনি ২০১৫ সাল থেকে সঞ্চালনা করে আসা তাঁর ফ্ল্যাগশিপ সংবাদ বুলেটিন থেকে সরে দাঁড়াবেন। আগামী সোমবার থেকে তাঁর জায়গায় সংবাদ উপস্থাপক জিন-ব্যাপটিস্ট মার্তো দায়িত্ব নিতে পারেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীদের ভিড়

ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মারিন লে পেন ২০২৭ সালের নির্বাচনে এলিসি প্রাসাদে (ফরাসি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) যাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ দেখছেন। এর আগে তিনি তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ টানা দুই মেয়াদ পূর্ণ করায় এবার আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে মাখোঁর মধ্যপন্থী দল এবং বামপন্থী শিবিরের অসংখ্য প্রার্থী ইতিমধ্যেই তাদের প্রার্থিতার কথা ঘোষণা করেছেন।

আমূল পরিবর্তনকামী বা উগ্র বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলেঁশঁ এবার চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে লড়ছেন। অন্যদিকে, অন্তসত্ত্বা থাকা অবস্থাতেই যৌথ প্রাইমারির প্রচার চালাচ্ছেন গ্রিন পার্টির প্রধান মারিন তন্দেলিয়ে। গ্রিন পার্টির সাবেক মন্ত্রী ডেলফিন বাথোও পরিবেশবাদী রাজনীতি টিকিয়ে রাখার তাগিদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। এছাড়া সোশ্যালিস্ট পার্টি (PS)-এর প্রথম সম্পাদক অলিভিয়ের ফরে এবং এমনকি সাবেক সোশ্যালিস্ট প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদও নির্বাচনে লড়ার কথা বিবেচনা করছেন। ২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ২৫ জনেরও বেশি প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন।

জনমত জরিপ অনুযায়ী, রাফায়েল গ্লুকসম্যান—যিনি তরুণদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং যাঁকে ঘিরে ফ্রান্সে ‘গ্লুকসম্যানিয়া’ বা উম্মাদনা চলছে—১০ থেকে ১২ শতাংশ ভোট পেতে পারেন। এই স্কোরটি সম্মানজনক হলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। তবে সর্বশেষ ইউরোপীয় নির্বাচনে তিনি সোশ্যালিস্ট পার্টি ও প্লেস পাবলিকের যৌথ জোটের নেতৃত্ব দিয়ে ১৩.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, যা তাঁকে বামপন্থী শিবিরের অন্যতম শীর্ষ নেতায় পরিণত করেছে।

বামপন্থীদের ভোট যেন ভাগ হয়ে না যায়, সেজন্য সোশ্যালিস্ট পার্টি এবং প্লেস পাবলিক আগামী অক্টোবরে একটি ‘ক্লোজড প্রাইমারি’ বা অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে একক প্রার্থী বাছাইয়ের পরিকল্পনা করছে। এই প্রক্রিয়ায় কেবল সোশ্যালিস্ট পার্টি ও প্লেস পাবলিকের নিবন্ধিত সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন, যা গ্লুকসম্যানের পক্ষে একক প্রার্থী হওয়া সহজ করবে। গ্লুকসম্যানের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বা পরিকাঠামো না থাকায়, ঐতিহ্যবাহী সোশ্যালিস্ট পার্টির সাংগঠনিক শক্তির ওপর তাঁকে অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবনে বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক আন্দ্রে গ্লুকসম্যানের ছেলে রাফায়েল ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে জর্জিয়ার প্রশ্চিমি ও রুশ-বিরোধী সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল সাকাশভিলির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন। মিখাইল সাকাশভিলি বর্তমানে তাঁর নিজ দেশে কারাবন্দি রয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কট্টর সমর্থক এবং উগ্র ডানপন্থার ঘোর বিরোধী গ্লুকসম্যান রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তার পক্ষে অত্যন্ত সোচ্চার এবং ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।

এদিকে, সাংবাদিক লিয়া সালামে সাময়িকভাবে উপস্থাপনা থেকে সরে দাঁড়ালেও তাঁর সাংবাদিকতার সততা নিয়ে কোনো আপস করবেন না বলে স্পষ্ট করেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একজন স্বাধীন ও সৎ সাংবাদিক এবং একজন মুক্ত নারী।’ তবে তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠাকে তিনি ‘যৌক্তিক’ বলেই মনে করেন।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version