মঙ্গলবার, ২৫ই আগস্ট, ২০২৬   |   ১০ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ ট্রিলিয়ন (৪০ লাখ কোটি) ডলারের বিশাল পর্বতসম ঋণ এখন শুধু ওয়াশিংটনের একার নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য এক বড় ধরনের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ নেওয়ার ব্যয় (ইউটিলিটি কস্ট বা বন্ড ইল্ড) বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ, জনসংখ্যা হ্রাস এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় পরিবর্তনের ফলে ওয়াশিংটনের অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়েছে—বিনিয়োগকারীদের এমন আশঙ্কার কারণেই মূলত এই অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইউরোপের আর্থিক বাজারগুলোতেও। কারণ বিশ্বব্যাপী গচ্ছিত সঞ্চয়ের তহবিল থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। চলতি বছর এই প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য বাজার থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মানদণ্ড জার্মানির ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের সুদের হার চলতি সপ্তাহের শুরুতে ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় মার্কিন ৩০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বিগত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পরই মূলত জার্মানির বন্ডের দাম বাড়তে শুরু করে। একই সময়ে মার্কিন সরকারের মোট জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার খবর এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এর ফলে, অনেক ইউরোপীয় দেশের সরকার আগামী বছরের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধি বা জনকল্যাণমূলক খরচ কমানোর মতো চরম বৈরী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে, যদিও একই সময়ে তাদের সামরিক প্রতিরক্ষার ব্যয় বাড়ানোর একটি বড় চাপ রয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন এবং ইতালির মতো দেশগুলোতে এই অর্থনৈতিক চাপ আগামী বছরের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মারিন লে পেন ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতিকে তাঁর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধিকে ‘ম্যাক্রোঁবাদের ১০ বছরের নির্মম পরিণতি’ বলে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লে পেন বলেন, ‘জনসাধারণের অর্থ এখন যে আস্তাকুঁড়ে পরিণত হয়েছে, তা পরিষ্কার করার সময় এসেছে!’

যদিও এই সংকট সমাধানের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তিনি দেননি। সাবেক ফরাসি অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লে মেয়ার পাল্টা জবাবে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনার সব চেষ্টায় লে পেনের দল সবসময় বাধা দিয়েছে—বিশেষ করে ২০২৫ সালে সরকারের প্রস্তাবিত পেনশন সংস্কার কর্মসূচি বাতিল করতে বাধ্য করার পেছনে তাদের বড় ভূমিকা ছিল।

ফ্রান্সে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ঝুঁকি

বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে বছরের পর বছর ধরে ফ্রান্সের ব্যর্থতা মূলত বিনিয়োগকারীদের আস্থা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি এখন এতটাই নাজুক যে, ফরাসি বন্ড কেনার জন্য বিনিয়োগকারীরা এখন ইতালির চেয়েও বেশি সুদ দাবি করছেন। এর ফলে প্যারিস এখন ‘রিফাইন্যান্সিং রিস্ক’ বা ঋণ পুনর্অর্থায়নের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিগত ২০ বছরে ইউরোপের প্রায় সব দেশই বিশাল ঋণের বোঝা জমিয়েছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দা এবং করোনা মহামারির মতো পর্যায়ক্রমিক সংকটগুলো স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনের ক্রমবর্ধমান দায়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলোর অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ইউরো অঞ্চলের সরকারি খাতের মোট ঋণ ২০০৭ সালে জিডিপির ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে গত বছর ৮৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ইউক্রেন ও ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে এই বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে ইউরোপীয় কমিশন।

২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি রাখায় ঋণের এই বোঝা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এখন মুদ্রাস্ফীতি পুনরায় মাথা চাড়া দেওয়ায় পুরো সমীকরণ বদলে গেছে। ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ইসিবি চলতি বছর ইতিমধ্যেই একবার সুদের হার বাড়িয়েছে। শ্রোডার্স-এর বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রধান ডেভিড রিস ধারণা করছেন, বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার আরও দুই দফা বৃদ্ধি পেতে পারে।

এর ফলে, ১০ বছর আগে প্রায় বিনামূল্যে ইস্যু করা বন্ডগুলো এখন সরকারকে অনেক উচ্চ সুদে রিফাইন্যান্স বা পুনরায় ঋণ নিতে হচ্ছে। ফরাসি জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস ‘ইনসি’ অনুমান করছে যে, ঋণের সুদের পেছনে প্যারিসের বার্ষিক ব্যয় ২০২০ সালের ৩০ বিলিয়ন ইউরো থেকে ৪ গুণ বেড়ে ২০৩০ সালে ১২ হাজার ৪০০ কোটি (১২৪ বিলিয়ন) ইউরোতে পৌঁছাবে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ স্বাস্থ্যখাত, সবুজ জ্বালানি রূপান্তর কিংবা কর হ্রাসের মতো গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করা যেত, যা এখন কেবল ঋণের সুদ মেটাতেই চলে যাবে।

ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালির জর্জিয়া মেলোনি এবং স্পেনের পেড্রো সানচেজও আগামী বছর পুনর্নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছেন। এছাড়া ফিনল্যান্ড, গ্রিস, এস্তোনিয়া, স্লোভাকিয়া এবং পোল্যান্ডেও আগামী বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তবে মেলোনি এবং সানচেজ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ইতালির নতুন বন্ডগুলো আগের তুলনায় খুব বেশি ব্যয়বহুল হয়নি। আর স্পেনে পেড্রো সানচেজ ২০২২ সাল থেকে নতুন কোনো বাজেট পাস করতে না পারলেও, তাঁর উদার অভিবাসন নীতির কারণে দেশের জনসংখ্যা ও জিডিপি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ঋণের বোঝা বহনের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের মতে, স্পেনের ঋণ এ বছর জিডিপির ১০০ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে।

কতটা ঝুঁকিতে ইউরোপ?

অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপ এখনই কোনো নতুন ঋণ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে না। কারণ ইউরো জোনের সম্মিলিত বাজেট ঘাটতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় মাত্র অর্ধেক। এছাড়া ২০১০ সালের সার্বভৌম ঋণ সংকটের মতো পরিস্থিতি এড়াতে ইসিবি এবং ইইউ ইতিমধ্যেই তাদের নীতিমালায় কঠোর সংস্কার এনেছে। তাছাড়া, জার্মানিতে ফ্রিডরিশ মার্জের সরকারের নতুন সংস্কারগুলো ইইউর সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বেরেনবার্গ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হোলগার শ্মিডিং।

তা সত্ত্বেও ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অলিভিয়ার ব্লানচার্ড সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমাদের বর্তমান ঋণ ও বাজেট ঘাটতির কারণে আমরা সম্ভবত একটি বড় বিপদ সীমানায় প্রবেশ করেছি, যেখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের আর্থিক সংকট দেখা দিতে পারে।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version