বৃহস্পতিবার, ২০ই আগস্ট, ২০২৬   |   ৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলতি বছর প্রায় ৯ হাজার অভিবাসীকে ডিপোর্ট বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে জার্মানি। রাজ্য বা স্থানীয় প্রশাসনগুলো এসব অভিবাসীর হদিস হারিয়ে ফেলায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে অন্তত ৮,৮২৬টি জোরপূর্বক বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশন স্থগিত করতে হয়েছে। মূলত অভিবাসীরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় কিংবা নিজেদের বর্তমান ঠিকানা প্রশাসনকে জানাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ডিপোর্টেশনের তালিকায় প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী, অবৈধ অভিবাসী এবং জার্মানিতে অপরাধের দায়ে দণ্ডিত বিদেশি নাগরিকেরা ছিলেন।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জার্মানির ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পার্টি কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, যেসব অভিবাসীর বিরুদ্ধে বহিষ্কারের আদেশ রয়েছে, তারা যেন দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে না পারে সেজন্য তাদের সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

সিডিইউ-এর অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মুখপাত্র গুন্টার ক্রিংস জার্মান সংবাদপত্র ‘ডাই ওয়েল্ট’-কে বলেন, ‘যারা আত্মগোপনে যাবে, তাদের সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। আইনের শাসনকে কোনোভাবেই তামাশায় পরিণত করতে দেওয়া যাবে না।’

জার্মান ট্যাবলয়েড ‘বিল্ড’-এ প্রথম প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান চ্যান্সেলর এবং সিডিইউ নেতা ফ্রিডরিশ মার্জের সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। বর্তমানে মার্জের সরকারের জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা, কারণ অভিবাসন বিরোধী ও উগ্র ডানপন্থী দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) দেশে বিপুল জনসমর্থন পাচ্ছে। আগামী মাসে পূর্ব জার্মানির দুটি রাজ্য নির্বাচনে এএফডি বড় ব্যবধানে জয়ী হতে পারে এবং প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক সরকার গঠন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পপুলিস্ট দল এএফডি চ্যান্সেলর মার্জের এই অভিবাসন নীতিকে ‘বিপর্যয়’ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার সাম্প্রতিক উদ্যোগকে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে চ্যান্সেলর হওয়ার পর থেকেই ফ্রিডরিশ মার্জ অভিবাসন বিষয়ে তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

অবশ্য সিডিইউ-এর সহযোগী দল ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিএসইউ) দাবি করেছে, ডিপোর্টেশন ব্যাহত হওয়ার এই ব্যর্থতার দায় কেন্দ্রীয় সরকারের নয়, বরং রাজ্য প্রশাসনগুলোর। সিএসইউ-এর সিনিয়র এমপি আলেকজান্ডার হফম্যান বলেন, অভিবাসীরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য ডিপোর্টেশনের আগের বন্দিশালা বা ডিটেনশন সেন্টারে তাদের আটকে রাখার হার বাড়াতে হবে।

জার্মানির ফেডারেল বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনুযায়ী, দেশের ১৬টি অঙ্গরাজ্য ডিপোর্টেশন আদেশ কার্যকর করার জন্য দায়ী। এর মধ্যে অভিবাসীদের খুঁজে বের করা এবং তাদের আটক রাখার দায়িত্বও রাজ্যগুলোর ওপর ন্যস্ত। জার্মানিতে আইন অনুযায়ী সব নাগরিক ও বাসিন্দার জন্য বর্তমান ঠিকানা নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো অভিবাসী যদি তা না করেন, তবে পুলিশ তাদের অবস্থান সনাক্ত করতে পারে না। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব হলো কেবল চূড়ান্ত ডিপোর্টেশন সম্পন্ন করা, যার মধ্যে অভিবাসীদের বিমানবন্দরে নিয়ে বিমানে তুলে দেওয়া অন্তর্ভুক্ত।

এমপি হফম্যান বলেন, ‘ডিপোর্টেশন ডিটেনশন সেন্টারে জায়গার সংখ্যা বাড়ানো রাজ্যগুলোর দায়িত্ব, যাতে আমরা সামগ্রিকভাবে ডিপোর্টেশনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারি।’

চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জের সরকার, যার মধ্যে মধ্য-বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরাও অংশীদার রয়েছে, গত বছরের মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেশ কিছু নতুন অভিবাসন নীতি ঘোষণা করেছে। তারা অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে জার্মানির সব স্থল সীমান্তে পুনরায় তল্লাশি চৌকি চালু করেছে এবং একটি ‘ডিপোর্টেশন অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য মূলত অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ও প্রত্যাখ্যাত আফগান আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানো। এজন্য বার্লিন ইতিমধ্যে কাবুলের তালেবান সরকারের সঙ্গেও একটি বিশেষ সমঝোতা করেছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version