ইতালির রাজধানী রোমে সম্প্রতি একটি বিশেষ ধরনের চার‑দেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে অংশ নিয়েছেন ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়াতেদোসি, স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফেরনান্দো গ্রান্ডে‑মার্লাসকা, গ্রিসের মাইগ্রেশন ও অভিবাসন মন্ত্রী আতনাসিওস প্লেভ্রিস এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি। এই বৈঠকটি অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, অপরাধ চক্র ভাঙা এবং নিয়ন্ত্রিত/আইনি অভিবাসন‑ পথ তৈরির বিষয়ে যৌথ কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে করা হয়েছে।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, কীভাবে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের চক্রগুলো ভাঙা যায়, একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত ও আইনি অভিবাসনের পথ তৈরি করা যায় যাতে ইউরোপে আসার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নৌ পথ ও বিপজ্জনক যাত্রা কমে আসে। এই নতুন কৌশলটি শুধু আইন প্রয়োগের সমন্বয়ই নয়, বরং আইনগত অভিবাসন‑পথ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অভিবাসীদের সুযোগ ও নিরাপদ পন্থা সরবরাহ করাকে কেন্দ্র করে।
ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়াতেদোসি বৈঠকে তুলে ধরেন যে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইররেগুলার মাইগ্রেশন (অবৈধ অভিবাসন) প্রবাহে নেমে আসা মৃত্যুর ঘটনা, মানবপাচার, অপরাধ চক্রের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব হবে। বৈধ অভিবাসনের পথগুলো তৈরি করে অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও শক্তিশালী কর্মসূত্র প্রদান করা যাবে, যা ইউরোপে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাওয়ার চাপ কমাবে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি বৈঠকে বলেন যে তার দেশ ইতোমধ্যেই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ম ও পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে ইউরোপে অবৈধ অভিবাসনের প্রবাহ প্রায় ৪৭ শতাংশ কমেছে। তিনি জানান এই ধরণের যৌথ নীতিমালা গ্রহণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে সামগ্রিকভাবে মানবপাচার কারবার, নৌ দুর্যোগ ও ঝুঁকিপূর্ণ শরণার্থী যাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমবে।
সংশ্লিষ্ট সংবাদগুলোতে বলা হয়েছে চারটি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা সম্মত হয়েছেন যে নিয়ন্ত্রিত ও আইনি অভিবাসনের পথ তৈরি করা হবে, যাতে অভিবাসীদের জীবন ও আত্মীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং মানব পাচারকারীদের ব্যবসায় বাধা দেওয়া যায়। এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আইনি মাইগ্রেশন পাথওয়ে সম্প্রসারণ, যাতে অভিবাসীরা অবৈধ পদ্ধতির পরিবর্তে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশের শ্রম বাজারে সুযোগ পেতে পারে।
এই সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিটি দেশ তাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। বিশেষত স্পেন ও গ্রিসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, তাদের দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার চ্যালেঞ্জগুলো প্রকট হয়েছে, এবং দক্ষতা ও সমন্বিত কৌশল ছাড়া তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এই কারণেই তারা এই সম্মিলিত পদক্ষেপে অংশ নিতে আগ্রহী হয়েছেন এবং আইনি অভিবাসনের পথগুলো তৈরি করা এর একটি কার্যকর উপায় বলে উল্লেখ করেছেন।
ইতালির ডেক্রেতো ফ্লুসসি নামক অভিবাসন নীতি ইতিমধ্যেই শ্রমবাজারে দক্ষ ও অ-দক্ষ শ্রমিকদের জন্য আইনি অভিবাসনের সুযোগ তৈরি করে রেখেছে, এবং এই বৈঠকের সাথে মিলিয়ে বলা হচ্ছে যে এই নীতির ফলে ইতালি আরও দক্ষ শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারবে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আগত তরুণ শ্রমিকদের জন্য।
বৈঠকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল সমন্বিত তথ্য‑ভাগাভাগি, সীমান্ত নিরাপত্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি‑ভিত্তিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়ে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও সমর্থন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে অভিবাসন‑নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কার্যক্রমে উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা সম্ভব হয়।
পাশাপাশি সম্মেলন থেকে একটি ঘোষণা এসেছে যে, অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজনরা (বিশেষত মানবপাচার বা নেশা পাচার‑জাতীয় গুরুতর অপরাধে) ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে তাদের নিজ নিজ দেশের আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা হবে। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।
বৈধ অভিবাসনের পথ তৈরির প্রসঙ্গে ইতালির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই ১০ হাজার ৫০০টি ওয়ার্ক ভিসা পাকিস্তানের দক্ষ শ্রমিক দের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে তারা আইনগতভাবে ইতালিতে প্রবেশ করে কাজ করতে পারে, এটি বৈধ অভিবাসনের পথ সম্প্রসারণের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
এই বৈঠকটি শুধুমাত্র একটি একবারের উদ্যোগ নয়, সম্মেলনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে এই চার‑দেশীয় সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গভীরভাবে চালানো হবে, এবং এই বছরের শেষে আবার পাকিস্তানে একটি ফলো‑আপ বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে যাতে সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন ও নতুন কর্মসূচি ঠিক করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের বৈঠক এবং আইনি অভিবাসন‑পাথওয়ে সম্প্রসারণ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ নৌ পথে যাত্রা ও মানবপাচারকারীদের দাপট কমবে এবং অভিবাসীরা আইনি, নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পথ থেকে বিভিন্ন দেশে সুযোগ পাবে।
