পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে-এ সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত ফুড গার্ডেন রেস্টুরেন্টে-এ হঠাৎ হামলার ঘটনায় অন্তত ৪ থেকে ৫ জন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে রেস্টুরেন্টের কর্মচারী ও কয়েকজন ক্রেতা রয়েছেন। স্থানীয় সময় রাতের ব্যস্ত সময়ে এই হামলা সংঘটিত হওয়ায় ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, দুই থেকে তিনজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামে। তারা মুখোশ পরিহিত ছিল এবং দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। মুহূর্তেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রেস্টুরেন্টের ভেতরে থাকা লোকজন চিৎকার করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কেউ কেউ টেবিলের নিচে বা রান্নাঘরের ভেতরে আশ্রয় নেন। গুলির শব্দে আশপাশের দোকানপাটও দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশে খবর দেন।
আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, কয়েকজনের শরীরে গুলি লেগেছে, আবার কেউ কেউ ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে আহত হয়েছেন। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেলেও বাকিদের অবস্থা স্থিতিশীল। হাসপাতাল সূত্রে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং আহতদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ঘটনার পরপরই পর্তুগালের জাতীয় পুলিশ বাহিনী (পিএসপি) এলাকা ঘিরে ফেলে। ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি পরিকল্পিত হামলা। হামলাকারীরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নিয়েই এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি নাকি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অংশ, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের মতে, পর্তুগালে বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, রেস্টুরেন্ট পরিচালনা, খুচরা বাণিজ্য ও বিভিন্ন সেবাখাতে কাজ করে আসছেন। লিসবনসহ আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় বহু বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কমিউনিটির কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় চাঁদাবাজি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তা বড় কোনো সহিংসতায় রূপ নেয়নি, তবে এই হামলার পর অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। কেউ কেউ রেস্টুরেন্টে নিরাপত্তা ক্যামেরা ও প্রাইভেট সিকিউরিটি বাড়ানোর কথা ভাবছেন। আবার কেউ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
এদিকে পর্তুগালের লিসবনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ঘটনার পরপরই আহতদের খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং আহতদের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রয়োজনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দূতাবাস প্রবাসীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন শহরে অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতার ঘটনা ঘটে থাকে। তবে লিসবনের মতো তুলনামূলক শান্ত শহরে এমন প্রকাশ্য গুলিবর্ষণ বিরল। পর্তুগাল সাধারণত ইউরোপের নিরাপদ দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এই ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও হামলার কারণ উদঘাটন না হলে প্রবাসী সমাজে আতঙ্ক আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামলার সময় এলাকায় শিশু ও পরিবারসহ বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাদের অনেকেই মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। গুলির শব্দ ও চিৎকারে পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে পুলিশি উপস্থিতি ও তদন্ত কার্যক্রমের কারণে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, হামলাকারীরা পেশাদার কৌশলে দ্রুত আঘাত হেনে পালিয়ে গেছে। তারা সম্ভবত আগেই এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছিল। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণও চালানো হচ্ছে।
প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠনগুলো জরুরি সভা ডেকে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি তুলেছে। তারা বলছেন, বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে জীবনযাপন করা মানুষের ওপর এমন হামলা মেনে নেওয়া যায় না। কমিউনিটি নেতারা স্থানীয় সিটি কাউন্সিল ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ বৈঠকের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল বৃদ্ধি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। আবার কেউ কেউ ইউরোপে অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে কমিউনিটির প্রবীণ সদস্যরা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ করেছেন।
সব মিলিয়ে, লিসবনের ফুড গার্ডেন রেস্টুরেন্টে গুলিবর্ষণের এই ঘটনা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা হয়ে এসেছে। আহতদের চিকিৎসা, পুলিশের তদন্ত এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ, সবকিছু এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কমিউনিটি। দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের মাধ্যমেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে, এবং নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
