বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পর্তুগালে সম্প্রতি শিক্ষা ও শিশু অধিকার রক্ষায় একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্কুল চলাকালীন মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা বা ফোন কেড়ে নেওয়া অনেক দেশে সাধারণ বিষয় হলেও, পর্তুগাল শিশু অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

আধুনিক বিশ্বে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে মোবাইল ফোন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশে শিক্ষক বা স্কুল কর্তৃপক্ষ অবাধ্য শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন সাময়িকভাবে জব্দ বা ‘কনফিস্কেট’ করে থাকে। কিন্তু পর্তুগালের আইন বলছে ভিন্ন কথা। সেখানে শিশুর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা এতটাই কঠোর যে, কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীর ফোন জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া বা আটকে রাখা আইনত জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।

আইন ও দর্শন

পর্তুগালের সংবিধানে এবং শিশু সুরক্ষা আইনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশটির আইন বিশেষজ্ঞদের মতে…

একটি শিশুর মোবাইল ফোন তার ব্যক্তিগত জীবনের অংশ। শিক্ষক যদি সেটি কেড়ে নেন, তবে তা শিশুর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশে যখন ক্লাসরুমে মোবাইল নিষিদ্ধ করার হিড়িক পড়েছে, পর্তুগাল তখন জোর দিচ্ছে “শাস্তি নয়, সচেতনতা”-র ওপর।

ফোন কেড়ে নেওয়া কেন নিষিদ্ধ?

পর্তুগিজ শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সাথে কোনো অপরাধীর মতো আচরণ করা আইনত নিষিদ্ধ। ফোন কেড়ে নেওয়াকে সেখানে শারীরিক বা মানসিক জবরদস্তি হিসেবে দেখা হয়। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো, জরুরি প্রয়োজনে শিশুর অভিভাবকের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফোনটিকে দেখা হয়। ফোন কেড়ে নিলে শিশুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। শিশুর ডিজিটাল ডাটা বা ফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার দায়ভার রাষ্ট্রের। জোরপূর্বক কিছু কেড়ে নেওয়া শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক নষ্ট করে।

আবাসন পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতা

পর্তুগালে আবাসন বা জেলা পরিবর্তন করলে প্রশাসনিক অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে যারা অভিবাসী, তাদের জন্য স্কুল পরিবর্তন বা নতুন জেলায় নথিভুক্ত হওয়ার সময় শিশু অধিকারের এই নিয়মগুলো কড়াকড়িভাবে জানানো হয়। যদি কোনো স্কুল বা জেলা কর্তৃপক্ষ শিশুর অধিকার লঙঘন করে ফোন জব্দ করার মতো পথে হাঁটে, তবে অভিভাবকরা সরাসরি স্কুল কাউন্সিল বা আইনি সংস্থায় অভিযোগ করতে পারেন।

বিকল্প সমাধান

পর্তুগালের স্কুলগুলোতে ফোন কেড়ে নেওয়ার বদলে কিছু আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ক্লাসের শুরুতে শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় লকারে ফোন রেখে দেয়। স্কুল প্রাঙ্গণে নির্দিষ্ট এলাকা থাকে যেখানে ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে তা জবরদস্তিমূলক নয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের সাথে চুক্তি করে যাতে শিশুরা ক্লাসে ফোন বের না করে। নিয়ম ভাঙলে ফোন কেড়ে না নিয়ে বরং পয়েন্ট কেটে নেওয়া বা অভিভাবককে ডেকে সতর্ক করা হয়।

অন্য দেশের সাথে তুলনা

ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে স্কুল চলাকালীন মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার আইন রয়েছে এবং সেখানে ফোন জব্দ করা একটি সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু পর্তুগাল মনে করে, প্রযুক্তিকে ভয় পেয়ে বা কেড়ে নিয়ে নয়, বরং তার সঠিক ব্যবহার শিখিয়েই আগামীর নাগরিক তৈরি করতে হবে। পর্তুগালের এই কঠোর শিশু সুরক্ষা আইন দেশটিকে বিশ্বের কাছে একটি “চাইল্ড-ফ্রেন্ডলি” দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পর্তুগালে শিক্ষা মানে কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সম্মান করা। সেখানে একজন শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন তার ব্যক্তিগত অস্তিত্বের অংশ, যা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের বা স্কুলের নেই।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version