পর্তুগালের রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশন ব্যবস্থা কাগজে-কলমে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও আদতে তা এক বড় ধরনের ‘বিভ্রম’। আগামী বছরগুলোতে অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক জর্জ ব্রাভোর নেতৃত্বে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ দলের তৈরি করা “রিফর্মিং পেনশন্স ইন পর্তুগাল: ফর আ সাসটেইনেবল অ্যান্ড ফেয়ার সিস্টেম” শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে পর্তুগালের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকৃত ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ১৯৪ কোটি (১.৯৪ বিলিয়ন) ইউরো। সরকারি হিসাবে যে তহবিল উদ্বৃত্ত দেখানো হচ্ছে, তা মূলত বিভ্রান্তিকর। কারণ এই হিসাবে সিজিএ বা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ব্যবহৃত পৃথক পেনশন ব্যবস্থার হিসাবটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক ব্রাভো সতর্ক করে বলেছেন, একজন কর্মীর শেষ বেতনের কত শতাংশ তিনি পেনশন হিসেবে পাবেন (রিপ্লেসমেন্ট রেট), সেই হারটি বর্তমানে ৬৮ শতাংশ হলেও ২০৪৫ থেকে ২০৬৫ সালের মধ্যে তা আরও ১০ থেকে ১২ শতাংশ হ্রাস পাবে। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নতুন প্রস্তাব দিয়েছে বিশেষজ্ঞ দলটি।
তবে ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পর্তুগালের দুজন শীর্ষ ব্যক্তিগত অর্থায়ন (পার্সোনাল ফাইন্যান্স) বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে, নাগরিকদের কেবল সরকারি পেনশনের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের অবসরকালীন জীবনের জন্য স্বাধীনভাবে এখনই ব্যক্তিগত বিনিয়োগ শুরু করা উচিত।
১. শিশু ও তরুণদের জন্য সঞ্চয় হিসাব (Grão a Grão):
প্রতিবেদনের একটি অন্যতম প্রস্তাব হলো ‘গ্রাও আ গ্রাও’ (দানা দানা বা ধাপে ধাপে) সঞ্চয় পরিকল্পনা। এর আওতায় দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি সঞ্চয় হিসাব খোলা হবে, যেখানে রাষ্ট্র প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট টোকেন অর্থ জমা করবে। পরবর্তীতে পরিবার বা আত্মীয়স্বজনরা সেই অ্যাকাউন্টে বাড়তি টাকা যোগ করতে পারবেন। এই জমানো অর্থ কেবল অবসরের বয়সে পৌঁছালে তোলা যাবে।
‘মানিল্যাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যক্তিগত অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ বারবারা বারোসো এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক বললেও কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কেবল সঞ্চয়কারী দেশ হলে চলবে না, বিনিয়োগকারী দেশ হতে হবে। মাত্র ১ শতাংশ সুদে টাকা ফেলে রাখলে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির কারণে টাকার মান কমে যাবে। পুঁজিবাজারের মতো কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু লাভজনক জায়গায় এই অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত।’ একই মত পোষণ করে অপর বিশেষজ্ঞ হোসে সান্তিয়াগো গাভিনো বলেন, গত ১০০ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে করা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সবসময় বেশি লাভজনক হয়।
২. স্বয়ংক্রিয় কর্মক্ষেত্র পেনশন স্কিম:
দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হলো একটি পরিপূরক পেনশন স্কিম, যেখানে নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে যাবেন। তবে চাইলে এই স্কিম থেকে যেকোনো সময় নিজের নাম প্রত্যাহার করার সুযোগ থাকবে। এতে কর্মী, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র যৌথভাবে বেতনের ৮ থেকে ১০ শতাংশ অর্থ জমা করবে।
বারবারা বারোসো বলেন, ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার এই পদ্ধতিটি মানুষের আলসেমি কাটাতে এবং অবসরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।’ হোসে গাভিনো জানান, পর্তুগালের কিছু বেসরকারি সংস্থায় ইতিমধ্যেই এই ধরনের পরিপূরক পেনশন চালু রয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিমালার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৩. অবসরের জন্য বিশেষ সঞ্চয়পত্র:
বিশেষজ্ঞ দলটি অবসরের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদী সরকারি সঞ্চয়পত্র বা ট্রেজারি সার্টিফিকেট চালুর প্রস্তাব করেছে, যা থেকে এককালীন টাকা না তুলে নিয়মিত কিস্তিতে অবসরকালীন ভাতা পাওয়া যাবে। হোসে গাভিনো মনে করেন, যারা অবসরের খুব কাছাকাছি (৫ বা ১০ বছর দূরে) আছেন, তাদের জন্য এটি একটি নিরাপদ ও রক্ষণশীল বিনিয়োগ হতে পারে। তবে তরুণদের জন্য এটি খুব একটা লাভজনক হবে না।
অন্যদিকে, বারবারা বারোসো বলেন, নতুন কোনো সরকারি সঞ্চয়পত্রের প্রয়োজন নেই। কারণ সরকারি সঞ্চয়পত্র কেনার অর্থ হলো সরাসরি রাষ্ট্রকে ঋণ দেওয়া, যা কোনো বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিওতে বিনিয়োগ না হয়ে কেবল পর্তুগালের সার্বভৌম ঝুঁকির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে।
সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে এখনই ব্যক্তিগত বিনিয়োগের পরামর্শ।প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু প্রকাশের পর পর্তুগিজ সরকার দৈনিক ‘পাবলিকো’-কে জানিয়েছে যে, বর্তমান মেয়াদে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন করার পরিকল্পনা তাদের নেই। অথচ সরকার নিজেই এই গবেষণাটির অনুমোদন দিয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করদাতাদের উচিত সরকারের নতুন কোনো উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের উদ্যোগে পরিপূরক পেনশনের জন্য বিনিয়োগ শুরু করা।
হোসে গাভিনো বলেন, ‘আজকাল মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মাত্র ১ ইউরো, ২ ইউরো বা ২৫ ইউরো দিয়েও শেয়ার বাজার বা মিউচুয়াল ফান্ডে স্বয়ংক্রিয় বিনিয়োগ শুরু করা যায়, যার জন্য আগের মতো জটিল নথিপত্রের প্রয়োজন হয় না।’
বারবারা বারোসো দেশের কম মজুরির সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘অনেকেই হয়তো সর্বনিম্ন মজুরি পান, কিন্তু একটি বড় অংশ আছেন যারা চাইলেই মাসে ৫০ ইউরো সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতে পারেন। অথচ তারা তা না করে ব্যাংকে অলস টাকা ফেলে রাখছেন। দেশের ২০০ বিলিয়নেরও বেশি ইউরো ব্যাংকে অলস পড়ে আছে, যা মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গেও তাল মেলাতে পারছে না। তাই যাদের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তাদের উচিত কোনো নতুন সরকারি আইনের অপেক্ষা না করে আজই নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ শুরু করা।’
