রবিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০২৬   |   ৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপের কোটি কোটি চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারী আগামী সোমবার থেকে প্রথমবারের মতো চ্যাটবটের ভেতরের কথোপকথনে বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটে বিজ্ঞাপনের ব্যবহার নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অবস্থান এখনও স্পষ্ট না হওয়ার মাঝেই জনপ্রিয় এই এআই প্ল্যাটফর্মটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’ তাদের এই নতুন বিজ্ঞাপন কার্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে।

আগামী ২৪ আগস্ট থেকে ইউরোপের ৩১টি দেশে চ্যাটজিপিটি বিজ্ঞাপন সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী এই বিজ্ঞাপনের আওতাধীন বাজারের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০টিতে।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষামূলকভাবে বিজ্ঞাপনের ব্যবহার শুরু করে ওপেনএআই। পরবর্তীতে বছরের বিভিন্ন সময়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, ব্রাজিল, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় এই কার্যক্রম চালু করা হয়।

বিজ্ঞাপনগুলো কেবল চ্যাটজিপিটির ‘ফ্রি’ এবং ‘গো’ প্ল্যানের মতো তুলনামূলক সস্তা সংস্করণগুলোতে প্রদর্শিত হবে। তবে ‘প্লাস’, ‘প্রো’ এবং ‘এন্টারপ্রাইজ’ সাবস্ক্রাইবার বা প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীরা কোনো বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন না। ওপেনএআই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই পদক্ষেপটি ইউরোপীয় বিপণনকারীদের জন্য ‘মানুষের সক্রিয় অনুসন্ধান, তুলনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তগুলোতে সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছানোর একটি নতুন সুযোগ তৈরি করবে।’

ব্যবহারকারীদের আস্থা রক্ষা করা তাদের বিজ্ঞাপন নীতির মূল ভিত্তি দাবি করে ওপেনএআই জানিয়েছে, ‘আমরা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে ব্যবহারকারীদের কথোপকথন সম্পূর্ণ গোপন রাখি এবং কখনোই গ্রাহকের তথ্য বিক্রি করি না।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘চ্যাটজিপিটির ভেতরের বিজ্ঞাপনগুলো সবসময় স্পষ্ট লেবেলযুক্ত থাকবে এবং চ্যাটজিপিটির দেওয়া উত্তরের চেয়ে আলাদা থাকবে। বিজ্ঞাপনের কারণে চ্যাটজিপিটির দেওয়া উত্তরের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।’

তবে এই আশ্বাসের পরও বিজ্ঞাপন কার্যক্রমটি চালুর পর থেকেই নানা সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন সিনেটর এড মার্কি ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানসহ আরও ছয়জন প্রযুক্তি কর্মকর্তাকে চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেছিলেন যে—এআই চ্যাটবটের বিজ্ঞাপনগুলো ব্যবহারকারীদের মানসিক আবেগকে অপব্যবহার করতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য বা রাজনীতির মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কথোপকথনের সময় কীভাবে ওপেনএআই বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করবে?

এছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞাপন চালুর পর অনেক ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। প্রতি মাসে ৮ ডলার ফি দেওয়া ‘গো’ সংস্করণেও বিজ্ঞাপন দেখানোর সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন তাঁরা। কারণ তাঁদের মতে, টাকা দিয়ে সেবা কেনার অর্থ হলো সেখানে কোনো বিজ্ঞাপন থাকা উচিত নয়। অবশ্য ব্যবহারকারীরা চাইলে বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এবং সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপনহীন সেবা পেতে আরও বেশি মূল্যের প্রিমিয়াম সংস্করণ বেছে নিতে পারবেন।

এই নতুন কার্যক্রমটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহুল আলোচিত ‘এআই অ্যাক্ট’-এর কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই আইনটি এমন সব এআই সিস্টেমকে নিষিদ্ধ করে যা মানুষের অবচেতন মনকে প্রভাবিত করে বা তাদের দুর্বলতার অপব্যবহার করে বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করে।

গবেষক এবং ভোক্তা অধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, চ্যাটবটের কথোপকথন খুবই সংবেদনশীল বিষয়। একটি সাধারণ ব্যানার বিজ্ঞাপন বা স্পন্সর করা সার্চ রেজাল্টের চেয়ে চ্যাটবটের ভেতর বন্ধুসুলভ কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ চলে আসা বিজ্ঞাপনকে চিনে নেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এআই চ্যাটবটের এই বিজ্ঞাপনগুলো নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা আদালত এখনও চূড়ান্ত কোনো পরীক্ষা বা আইনি রায় দেয়নি।

বিজ্ঞাপন বিতর্কের পাশাপাশি ওপেনএআই আরেকটি বড় আইনি প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে, যা ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট -এর অধীনে নির্ধারিত হবে। ইউরোপীয় কমিশন বর্তমানে বিবেচনা করছে যে, চ্যাটজিপিটির সার্চ ফাংশন বা তথ্য খোঁজার প্রযুক্তিটিকে ‘খুব বড় অনলাইন সার্চ ইঞ্জিন’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে কি না। ইউরোপীয় ইউনিয়নে কোনো সেবার মাসিক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৫ মিলিয়ন বা সাড়ে ৪ কোটি অতিক্রম করলেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হয়।

ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র থমাস রেয়নিয়ার গত জুলাই মাসে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, এই ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া ‘অবশ্যই সম্ভব’ এবং তা যেকোনো সময় আসতে পারে। এই স্বীকৃতি পেলে ওপেনএআই-কে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হবে; যার মধ্যে রয়েছে বার্ষিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, স্বাধীন নিরীক্ষা (অডিট), একটি পাবলিক বিজ্ঞাপন ভাণ্ডার তৈরি করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে তথ্য শেয়ার করা।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version