পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের অন্যতম বৃহত্তম ও অত্যন্ত জনপ্রিয় নাইটক্লাব ‘কে আরবান বিচ’-এর বাইরে চরম বর্ণবাদের (রেসিজম) শিকার হয়েছেন এক মার্কিন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও তাঁর ভাই। এই আপত্তিকর ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত এই নাইটক্লাবটির বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিকবার বর্ণবাদী আচরণ ও সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর বয়সী এক পেশাদার ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফার (যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে nyc.buddha ইউজারনেম ব্যবহার করেন) শুক্রবার ভোরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি ক্যামেরায় ধারণ করেন। পরবর্তীতে তিনি এটিকে তাঁর জীবনের ‘সবচেয়ে জঘন্য বর্ণবাদী মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। ভিডিওটি পোস্ট করার পর তা ভাইরাল হয়, যদিও পরবর্তীতে এটি মুছে ফেলা হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ওই মার্কিন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং তাঁর ভাইকে নাইটক্লাবে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যার পেছনে একমাত্র কারণ ছিল তাদের গায়ের রঙ। একপর্যায়ে ক্লাবের নিরাপত্তারক্ষীকে ইংরেজিতে বলতে শোনা যায়, “হ্যাঁ, আমি কালো মানুষদের পছন্দ করি না।”
ভুক্তভোগী যুবক জানান, তারা যখন নাইটক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন, তখন নিরাপত্তারক্ষী প্রথমে তাঁদের কাছে প্রবেশ ফি হিসেবে অবাস্তবভাবে ২৫০ ইউরো (প্রায় ৩২ হাজার টাকা) দাবি করেন। যুবকটি যখন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি রসিকতা করছেন?” রক্ষী সরাসরি উত্তর দেন, “না, এটি আমার সিদ্ধান্ত, এটিই আমার কাজ।” অথচ ওই একই সময়ে শ্বেতাঙ্গ অন্য মানুষদের কোনো ফি ছাড়াই ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল।
এরপর দুই ভাই অনলাইনে গিয়ে সাধারণ মূল্যে মাত্র ৩২ ইউরো দিয়ে দুটি টিকিট কেনেন। টিকিট নিয়ে পুনরায় প্রবেশ করতে গেলে সেখানে থাকা এক নারী কর্মী ক্লাবটি ‘হাউসফুল’ বা পরিপূর্ণ দাবি করে তাদের টিকিট ফেরত নিতে বলেন। তখন যুবকেরা পুনরায় নিরাপত্তারক্ষীকে তাঁদের গায়ের রঙ ও চুলের ধরণ নিয়ে বৈষম্যের বিষয়ে প্রশ্ন করলে রক্ষী ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, “হ্যাঁ, আমি কালো মানুষদের পছন্দ করি না।” এ সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য এক কৃষ্ণাঙ্গ সহকর্মীকে দেখিয়ে রক্ষী বলেন, “ও আমার ভাই।” এর জবাবে মার্কিন যুবকটি যখন জিজ্ঞেস করেন, “তাহলে আমি আপনার কাছে কী? একজন নিগার (Nigga – একটি চরম আপত্তিকর বর্ণবাদী গালি)?” রক্ষী সরাসরি সম্মতি জানিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, তুমি একজন নিগার।” উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘নিগার’ শব্দটি কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অত্যন্ত অবমাননাকর ও আপত্তিকর একটি শব্দ হিসেবে বিবেচিত হয়।
লিসবনের টেগাস নদীর তীরে অবস্থিত এই অভিজাত নাইটক্লাবটির বিরুদ্ধে বর্ণবাদী বৈষম্য ও মারামারির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। পর্তুগালের বর্ণবাদ বিরোধী বেসরকারি সংস্থা ‘এসওএস রেসিজমো’-র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হোসে ফ্যালকাও ইউরোনিউজ-কে বলেন, ‘কমপক্ষে ২০১৩ সাল থেকে আমরা এই আরবান বিচ ক্লাবের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযোগ পাচ্ছি।’
এর আগে ২০১৪ সালে পর্তুগালের হয়ে অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী অ্যাথলেট নেলসন ইভোরা এই ক্লাবের বর্ণবাদের শিকার হয়েছিলেন। তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, টেবিলে বুকিং থাকা সত্ত্বেও কেবল তাঁদের গ্রুপে ‘বেশি কৃষ্ণাঙ্গ’ থাকায় আরবান বিচের ম্যানেজাররা তাঁদের প্রবেশ করতে দেননি।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ‘রুবেন মামলা’ নামে আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে। রুবেন নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ফরাসি তরুণকে আরবান বিচের প্রবেশদ্বারে ২৫০ ইউরো ফি দাবি করা হয়েছিল, অথচ তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য সব শ্বেতাঙ্গ বন্ধুদের বিনামূল্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এই ঘটনা নিয়ে সে সময় বাউন্সারদের সঙ্গে বড় ধরনের মারামারির সৃষ্টি হয়েছিল। পর্যটন বিষয়ক রিভিউ ওয়েবসাইট ‘ত্রিপঅ্যাডভাইজার’-এ খুঁজলে এই ক্লাবের বাউন্সারদের হিংস্র, অভদ্র ও বর্ণবাদী আচরণের শত শত অভিযোগ পাওয়া যায়।
২০১৭ সালের ঘটনার পর আদালতের নির্দেশে এই নাইটক্লাবটি সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়েছিল। এসওএস রেসিজমোর ফ্যালকাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে বছরের পর বছর মানুষকে এই ক্লাবের গেট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এই ধরনের অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও পর্তুগাল রাষ্ট্র কেন এই ক্লাবের বিরুদ্ধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা রহস্যজনক।’
মার্কিন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের এই ভিডিওটি প্রকাশের পর আরবান বিচ নাইটক্লাবের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ ও সেলিব্রিটিরা এই ক্লাবের বর্ণবাদী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্লাবটি বয়কটের ডাক দিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইউরোনিউজ আরবান বিচ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
