বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পর্তুগালের সরকার গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি নতুন আইন অনুমোদন করেছে, যা অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের দ্রুত দেশত্যাগ করার প্রক্রিয়া চালু করবে। এই সিদ্ধান্তকে পর্তুগালের ইমিগ্রেশন নীতি সংস্কারের সবশেষ বড় ধাপ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, যারা নিয়ম ভঙ্গ করে পর্তুগালে প্রবেশ করেছে বা অনিয়মিতভাবে বসবাস করছে, তাদের জন্য এই নতুন বিধি প্রযোজ্য হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হযেছে, নতুন এই আইন শুধুমাত্র অবৈধ অভিবাসীদের উদ্দেশ্য করে অনুমোদন করা হয়েছে। যারা বৈধভাবে বসবাস বা ভিসায় আছে, তাদের ওপর নয়। সরকারের ভাষায় এটি নিয়মভিত্তিক, নিয়ন্ত্রিত, এবং মানবিক অভিবাসন নীতি প্রতিষ্ঠার একটি অংশ।

নতুন আইনে কী কী শর্ত আরোপ করেছে

এই আইনে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বিদেশি বা বিদেশি নাগরিক -এর ফাইলগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নতুন পথ রয়েছে। পূর্বে যেসব আশ্রয় আবেদনের অপব্যবহার, অযথা অভিযোগ, বিলম্ব করানোর কৌশল কিংবা নথিপত্র নিয়ে খেলা করা হতো, সেগুলো বন্ধ করার জন্য নতুনভাবে কঠোর শর্ত যোগ করা হয়েছে। এবং সেগুলোর জন্য নতুন কিছু শর্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইন বলছে, আশ্রয় বা আবেদন-প্রক্রিয়া ব্যবহারে কোনো অপব্যবহার হবে না। দেশটির পুরনো সীমান্ত ও অভিবাসন সংস্থা (যেমন পূর্বে সক্রিয় ছিল) গুলোর পুনরায় গঠন বা ক্ষমতা বিন্যাস করা হয়েছে। এখন থেকে এ ধরনের নতুন সীমান্ত ও অভিবাসন‑নিয়ন্ত্রণ ইউনিট (যেমন বিদেশি ও সীমান্ত বিষয়ক ইউনিট) পরিচালনায় দায়িত্ব পাবে। একই সময়ে, আইন-প্রয়োগে মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ প্রত্যেকের প্রতিরক্ষা, আপিল  প্রক্রিয়াগত নিয়ম এবং বিশেষ করে শিশু ও দুর্বল অবস্থায় থাকা মানুষের রক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

নতুন নিয়মের প্রয়োজনীয়তা

পর্তুগালে অতীতে, যেভাবে অনিয়মিত অভিবাসী ও আশ্রয় আবেদনকারীদের নথিপত্র ও আবেদন বিলম্বিত হতো, তা ব্যবহার করে অনেকে নিয়মভঙ্গ করছিল, যা কর্মকর্তাদের মতে আইন মানতে অনিচ্ছার বার্তা দিচ্ছিল। ২০২৩ সালে পর্তুগাল এমন একটি দেশ ছিল, যাদের মধ্যে অভিবাসী উদ্ধার ও ফেরত পাঠানোর হার ছিল খুবই কম। চিহ্নিত কেসগুলোর হারও ছিল আনুমানিক ৫ শতাংশ-এর নিচে। তবে সরকারের মতে, এটি একটি ভুল বার্তা দিচ্ছিল।

সম্ভাব্য প্রভাব

যারা বৈধভাবে থাকার অনুমতি বা ভিসা নিয়েছেন, তাদের জন্য এখন হয়তো অভিবাসন ব্যবস্থা নির্দিষ্ট নিয়ম এবং বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হবে। বিচারহীন শিশু বা দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যক্তিরা যদি আবেদন করেন, তাহলে নতুন আইন অনুযায়ী তাদের প্রতিরক্ষা ও আপিলের অধিকার বজায় থাকবে, সরকার বলেছে, এমন ব্যক্তিদের কোনোভাবেই রক্ষার জন্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি হবে না। আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা ও দ্রুততা থাকলে, আগে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা কেসগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারে, যা প্রশাসনিক ব্যর্থতা কমাবে।

সমালোচনা

সমালোচকরা বলছেন, নতুন আইন অভিবাসীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে, এবং ভালোবাসা, আশ্রয় কিংবা মানবিক যুক্তি কম গুরুত্ব পাবে, বিশেষ করে যারা দ্রুত দেশ থেকে বহিষ্কার-এর আওতায় পড়বেন। আগের মতো আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধ করার উদ্দেশ্য থাকলেও, অনেকের মতে আইনে ফাঁক বা ত্রুটি থাকতে পারে, যাতে প্রকৃত শরণার্থীরাও হয়রানি হতে পারে। পরিবার-সংযুক্তি, নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া, এবং স্থায়ী বসবাসের জন্য আগ্রহীদের জন্য নতুন নিয়ম আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যা অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভয় বাড়াবে।

আইন যাদের জন্য প্রযোজ্য

নতুন আইন এখন প্রথমে জনগণের মতামত নেওয়ার প্রক্রিয়ার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, আইন চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার আগে সাধারণ মানুষ, অভিবাসী সমাজ ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়া হবে। পরবর্তীতে, সংশ্লিষ্ট সংসদ-এ এটি পাঠানো হবে। আইন চূড়ান্ত হলে, যারা অনিয়মিতভাবে বসবাস করছেন, তারা দ্রুত নিজেদের বৈধতা তুলে ধরতে হবে, নতুবা দেশ থেকে বহিষ্কার-এর মুখে পড়বেন। পাশাপাশি সরকার বলেছে, যারা নিয়মমাফিক বসবাস করছেন, তারা উপযুক্ত নথি ও আবেদন প্রক্রিয়া বজায় রাখলে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী তাদের অধিকার ও প্রক্রিয়া আগের মতোই মেনে চলা হবে।

অভিবাসন নীতিতে নতুন অধ্যায়

এই আইনকে পর্তুগালের অভিবাসন নীতির জন্য এক বৃহৎ সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ছিল এক ধরনের স্বীকৃতি, যা সবার জন্য উন্মুক্ত অভিবাসন নীতি বলেও ধরা হতো। তবে নতুন আইন এবং আইন প্রয়োগে দৃষ্টান্ত, নথিপত্র যাচাই, নিয়মভিত্তিক বসবাস এবং বহিষ্কার প্রক্রিয়ায় দ্রুততা, সব মিলিয়ে, এটাকে সেই পুরনো সবার জন্য উন্মুক্ত যুগের সমাপ্তি এবং নিয়ন্ত্রিত, কাঠামোগত ও  মানবিকতার নীতিমালায় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version