শনিবার, ৮ই আগস্ট, ২০২৬   |   ২৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগামী ১৫ আগস্ট স্পেনের ছিটমহল সেউতায় আবারও বড় ধরনের গণ-অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্পেনের সিভিল গার্ড এই বিষয়টির সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখে ছয় পৃষ্ঠার একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।

স্প্যানিশ গণমাধ্যম ‘মানিয়ানিরোস’-এর হাতে আসা এই নথিতে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি প্রচারণাকে ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সিভিল গার্ডের মতে, এই প্রচারণাটি ইতিমধ্যে লাখ লাখ অনুসারী বা ফলোয়ার সমৃদ্ধ গ্রুপগুলোতে পৌঁছে গেছে।

এই বিশ্লেষণটি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত তথ্য—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল—সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার এই অনলাইন আহ্বানটি আসলেই সত্য কি না, এটি কত দূর ছড়িয়েছে এবং এর পেছনে সমন্বয়ের মাত্রা কতটুকু, তা নির্ধারণ করা।

অবশ্য প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা হয়নি। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিই-র উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ আগস্টের এই কর্মসূচিতে কতজন লোক অংশ নিতে পারে তা অনুমান করার অথবা জুলাইয়ের শেষের দিকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে ধরে নেওয়ার মতো কোনো ভিত্তি তাদের কাছে নেই।

প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, অনলাইনে একটি সক্রিয় প্রচারণা রয়েছে যা মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষমতা রাখে। তবে এটি আসলেই কোনো গণ-অনুপ্রবেশ ঘটাবে কি না, কতজন মানুষ এতে অংশ নেবে এবং এর পেছনে কারা রয়েছে—তার সবকিছুই এখনও অজানা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে তা মূলত নির্ভর করছে মরক্কোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর—বিশেষ করে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, পরিবহন হাব, ফানিদিক শহর এবং উপকূলীয় এলাকায় মরক্কোর কঠোরতা এবং স্পেনের নিরাপত্তা অভিযানের ওপর।

তদন্তের সূত্রপাত কীভাবে হলো?

সিভিল গার্ডের মতে, গত জুলাইয়ের শেষ এবং আগস্টের শুরুর দিকে এই বার্তাগুলো প্রথম ছড়াতে শুরু করে। সে সময় মরক্কোর তরুণরা ১৫ আগস্টের কাছাকাছি সময়ে সেউতায় পৌঁছানোর জন্য আরেকটি যৌথ প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট শেয়ার করতে শুরু করেন।

প্রতিবেদনে স্পেন এবং মরক্কো উভয় দেশের সংবাদমাধ্যমের কভারেজ বা প্রচারণার তুলনা করা হয়েছে। 

এতে দেখা গেছে, বিষয়টি এখন আর কেবল স্পেনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তদন্তকারীরা ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইনস্টাগ্রামের এমন কিছু গ্রুপ পরীক্ষা করেছেন যেগুলোর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ থেকে ৪ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি। তবে প্রতিবেদনটিতে এই সংখ্যার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গ্রুপের আকার বড় হওয়াটি বড় বিষয় নয়, বরং তাঁরা সেখানে কিছু নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ধরন খুঁজে পেয়েছেন। যেমন—বারবার ১৫ আগস্টের উল্লেখ করা, একই ভৌগোলিক অবস্থানের কথা বলা, কীভাবে সীমান্ত পারাপার সংগঠিত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা এবং টানা কয়েক দিন ধরে এই বার্তাগুলোর উপস্থিতি। গত ৪ আগস্ট পর্যন্ত এই নজরদারি চালানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিপুল পরিমাণ ভুয়া তথ্য বা অপপ্রচারের খোঁজও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—সীমান্ত খুলে দেওয়া হবে, অভিবাসীরা রাজনৈতিক আশ্রয় বা আর্থিক সহায়তা পাবেন অথবা সেউতায় একবার পৌঁছাতে পারলে কাউকে আইনিভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না—এমন সব ভিত্তিহীন দাবি।

এই প্রচারণার নেপথ্যে কারা রয়েছে?

প্রতিবেদনে এই অনলাইন প্রচারণাকে একটি ‘বিকেন্দ্রীকরণ’ প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো একক আয়োজককে চিহ্নিত করার পরিবর্তে তদন্তকারীরা দেখেছেন যে, এই প্রস্তাবিত তারিখটি অত্যন্ত স্বাভাবিক উপায়ে এক অনলাইন গ্রুপ থেকে অন্য গ্রুপে ছড়িয়ে পড়েছে।

পর্যালোচনা করা উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিভিল গার্ড জানিয়েছে, তারা এই প্রচারণা চালানোর জন্য দায়ীদের শনাক্ত করতে পারেনি। এ ছাড়া এই প্রচারণার সাথে মরক্কো সরকার, মরক্কোর নিরাপত্তা সংস্থা বা নির্দিষ্ট কোনো মানব পাচারকারী নেটওয়ার্কের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে প্রতিবেদনটিতে এই ক্যাম্পেইনটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল—এমন ধারণা বাতিল করা হয়েছে। এতে এই সিদ্ধান্তে আসা হয়েছে যে, এর পেছনে ‘কিছুটা ডিজিটাল সুবিধা বা সহায়তা’ রয়েছে; অন্য কথায়, অনলাইন কার্যক্রমের পেছনে এক ধরনের সমন্বয়ের স্তরের অস্তিত্ব রয়েছে, যদিও এর উৎস ও পরিধি এখনও অস্পষ্ট।

ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, ১৫ আগস্টের আগে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।

কমিশনের মুখপাত্র গুইলাম মার্সিয়ার বলেন, ‘আমরা ১৫ আগস্টের আগে, চলাকালীন এবং পরে সম্পূর্ণ সতর্ক থাকব।’

তবে ব্রাসেলস সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অনেক প্রতিবেদন ‘যাচাই করা হয়নি’ এবং সামগ্রিক চিত্রটি এখনও ‘অস্পষ্ট’ রয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, তারা স্পেন ও মরক্কো উভয় দেশের কর্তৃপক্ষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে।

তারা আরও জানিয়েছে যে, তারা রাশিয়ার সাথে সম্পৃক্ত কিছু চ্যানেল শনাক্ত করেছে, যেগুলো গত ৩০ জুলাই থেকে এই অভিবাসন ইস্যুটিকে অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

কমিশন উল্লেখ করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই অনলাইন অপপ্রচার মোকাবিলায় ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’ (ডিএসএ)-এর মতো কঠোর আইন ব্যবহার করতে পারে। এই আইনটি প্রধান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সার্চ ইঞ্জিনগুলোকে জননিরাপত্তার জন্য পদ্ধতিগত ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন ও কমানোর নির্দেশ দেয়। তবে স্পেন এখনও ডিএসএ-র ক্রাইসিস মেকানিজম বা সংকটকালীন ব্যবস্থা সক্রিয় করেনি, যা মূলত প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে আরও জোরদার সমন্বয়ের সুবিধা দিত।

ইউরোনিউজ

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version