শুক্রবার, ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ২০ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পেনের উত্তর আফ্রিকা সীমান্তবর্তী সেউতা ছিটমহলের অভিবাসী সংকট সংক্রান্ত সব ধরনের নথি ও গোপন প্রতিবেদন প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ওই সংকটের সময় আসলে কী ঘটেছিল এবং সরকারের কাছে কী ধরনের গোয়েন্দা তথ্য ছিল, তা স্পষ্ট করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সীমান্তে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন এবং এই গণ-অনুপ্রবেশের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

স্পেনের পার্লামেন্ট কংগ্রেসে ভাষণ দেওয়ার সময় সানচেজ বলেন, ‘এই বিষয়ে সরকারের লুকানোর কিছু নেই। আমি সমস্ত নথিপত্রসহ একটি ডসিয়ার প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছি, যাতে সাধারণ মানুষ সেগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারে। প্রতিটি নথির ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হবে।’

চলতি গ্রীষ্মে সেউতা সীমান্তে অবৈধ অভিবাসীদের গণ-অনুপ্রবেশের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করে সানচেজ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ভূমিকা রক্ষা করে কথা বলেন। তিনি কংগ্রেসকে জানান, গত জুলাইয়ের ঘটনার ঠিক আগে স্পেনে অনুপ্রবেশে উৎসাহিত করে দেওয়া বিভিন্ন বার্তায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ‘ভরে গিয়েছিল’।

আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে সানচেজ বলেন, এই সংকটের নেপথ্যের ঘটনাগুলো নিয়ে ‘আজ পর্যন্ত আমরা যা জানি, তা সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে’ তুলে ধরা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গত জুলাই মাসে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা অভিবাসীদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গিয়েছিল, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার জোয়ারের সঙ্গে মিলে যায়।

সীমান্তে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তাদের প্রশংসা করে সানচেজ বলেন, ‘আমাদের কর্মকর্তাদের মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তারা মানুষের জীবন বাঁচানোকেই বেছে নিয়েছিলেন। আমরা তাদের এই সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গর্বিত।’

সরকার ও আইনপ্রণেতাদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসে বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা সীমান্ত আরও শক্তিশালী করেছিলাম এবং নতুন করে অনুপ্রবেশ বন্ধ করেছিলাম। ৭২ ঘণ্টা পর দেখা গেছে, ৯০ শতাংশেরও বেশি অভিবাসী নিজ দেশে ফিরে গেছেন।’ এটিকে ‘ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ইউরোপীয় কমিশনও এর স্বীকৃতি দিয়েছে।

অভিবাসীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার দাবির বিরোধিতা করে সানচেজ সরকারের আইনি বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি কংগ্রেসকে বলেন, ‘স্পেন একটি গণতান্ত্রিক দেশ। আপনি একজন মানুষের হাত ধরে তাকে ময়লার বস্তার মতো সীমান্তের ওপারে ছুড়ে ফেলে দিতে পারেন না। এখানে কিছু আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে, যা মেনে চলতে আমরা বাধ্য।’

এই সংকটের পূর্বাভাস কেন আগে পাওয়া যায়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে সানচেজ সরাসরি বলেন, ‘কোনো গোয়েন্দা সংস্থাই এই ধরনের গণ-অনুপ্রবেশের বিষয়টি আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি।’

গত ৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি রায়ের সঙ্গে সরকারের পদক্ষেপের যোগসূত্র টেনে তিনি ব্যাখ্যা করেন, সেই রায়ের পরই বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা সমুদ্রসীমায় নজরদারি বাড়িয়েছিলাম। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মরক্কো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছিলাম। পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম।’

তবে এই সংকট কীভাবে তৈরি হলো, সে বিষয়ে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি বলে স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি কংগ্রেসকে বলেন, ‘সেউতায় যা ঘটছে তা অনেক বেশি জটিল ও বহুমুখী।’

সানচেজ নিজের আগ্রহেই পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘কংগ্রেস অব ডেপুটিস’-এ হাজির হয়ে সেউতা পরিস্থিতি এবং সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন পেশ করেন। গত জুলাইয়ের শেষভাগে মরক্কো থেকে হাজার হাজার অভিবাসীর অনুপ্রবেশের পর সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগে সোশ্যালিস্ট সরকারের তীব্র সমালোচনার মুখে তার এই হাজিরা। এই পরিস্থিতি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়া এবং এই সংকটে মরক্কোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশটির বিরোধী দলগুলো জরুরি অবস্থা শুরুর পর থেকে নেওয়া সব সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা এবং এর পরিণতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা বিস্তারিত জানাতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে।

গত জুলাই মাসে সেউতায় প্রায় ৭০ হাজার অভিবাসী প্রবেশ করার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশে না দাঁড়িয়ে তাদের ‘পরিত্যাগ’ করার অভিযোগ তুলে সানচেজের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীরা। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ, সেভিল এবং খোদ সেউতা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসিন্দাদের সমর্থনে বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর পার্লামেন্টে ভাষণ দিলেন সানচেজ। মাদ্রিদে সরকারি প্রতিনিধি দলের মতে এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ, তবে সিটি কাউন্সিলের দাবি এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার। বিক্ষোভের অধিকাংশ শান্তিপূর্ণ হলেও রাতের শেষভাগে কংগ্রেস অব ডেপুটিস বা পার্লামেন্ট ভবনের আশপাশে কিছু বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।


শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version