সেউতা থেকে অবৈধভাবে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে অভিবাসী পাচারের অভিযোগে পৃথক দুটি তদন্ত শেষে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্প্যানিশ পুলিশ। জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দেওয়ার এই বিপজ্জনক যাত্রার জন্য অভিবাসীদের কাছ থেকে মাথাপিছু প্রায় ৯,০০০ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা) পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছিল বলে জানা গেছে।
স্পেনের জাতীয় পুলিশ শুক্রবার জানিয়েছে, স্প্যানিশ উত্তর আফ্রিকান শহর সেউতা থেকে আন্দালুসিয়া উপকূলের মধ্যে নৌকায় করে অভিবাসী পাচারকারী একটি চক্রের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযানে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুজনকে সেউতা থেকে এবং বাকি দুজনকে কাদিজ প্রদেশের লা লিনিয়া দে লা কনসেপসিয়ন থেকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে একটি অপরাধী চক্রের সদস্য হওয়া এবং অবৈধ অভিবাসনে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
দ্বিতীয় আরেকটি অভিযানে গত ১৪ আগস্ট সমুদ্রপথে বিপজ্জনকভাবে অভিবাসী পাচারের অভিযোগে পঞ্চম ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই দিন কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই একটি ছোট নৌকায় করে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার জন্য সাতজন অভিবাসী প্রত্যেকে ৮,০০০ ইউরো (প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা) করে পরিশোধ করেছিলেন।
গত জুলাইয়ের শেষভাগে সেউতা সীমান্তে মরক্কো থেকে প্রায় ৭২,০০০ অভিবাসীর নজিরবিহীন গণঅনুপ্রবেশের ঘটনার পরপরই এই দুটি তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ওই সময় সাগরে সাঁতার কেটে বা পায়ে হেঁটে হাজার হাজার মানুষ স্পেনের এই ছিটমহলে প্রবেশ করেছিল।
মাথাপিছু ৯,০০০ ইউরোর চুক্তি
সেউতার বেঞ্জু এলাকার পাথুরে উপকূলে একটি ছোট ও দ্রুতগতির স্পিডবোট পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়ার পর পুলিশের প্রথম তদন্তটি শুরু হয়। বোটটি পরীক্ষার পর পুলিশ বুঝতে পারে যে এটি অতি সম্প্রতি অভিবাসী পাচারের কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে যাত্রী তোলার আগেই এটি পাথরের সঙ্গে আটকে যায়।
পরবর্তীতে তদন্তে পুলিশ জানতে পারে যে, চক্রটি সম্প্রতি সেউতায় অবৈধভাবে প্রবেশ করা অসহায় অভিবাসীদের টার্গেট করে তাদের স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনপ্রতি ৯,০০০ ইউরো করে চুক্তি করত।
চুক্তি অনুযায়ী, সীমান্ত পার হওয়ার সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত অভিবাসীদের গোপনে বিভিন্ন ব্যক্তিগত বাড়ি, গ্যারেজ এবং গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হতো। এরপর নজরদারি এড়াতে বিশেষ গাড়ি ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে তাদের সমুদ্রের নির্দিষ্ট একটি পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হতো।
সেউতার ওপার থেকে স্পেনের আন্দালুসিয়া উপকূল থেকে একটি স্পিডবোট এসে তাদের তুলে নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী পার করিয়ে দিত। সেখানে চক্রের অন্য সদস্যরা অভিবাসীদের রিসিভ করে দ্রুত এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যেত। এই বিপজ্জনক অভিযানের জন্য তারা উচ্চ বেতনে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ বোট চালকদের নিয়োগ করত, যারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বোট চালাতে পারদর্শী।
দ্বিতীয় তদন্তটি ছিল গত ১৪ আগস্ট রাতের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও রোমহর্ষক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পুলিশ জানায়, মাত্র ৫ মিটার দীর্ঘ এবং ২ মিটার চওড়া একটি ছোট নৌকায় করে সাতজন অভিবাসীকে সমুদ্রপথে স্পেনের মূল ভূখণ্ডের দিকে পাঠানো হয়েছিল।
ভোর রাত আনুমানিক ৪টার দিকে লা লিনিয়ার এল বুর্গো সৈকত এলাকা থেকে এই সাত যাত্রীকে উদ্ধার করে পুলিশ। তারা কোনো লাইফ জ্যাকেট বা উদ্ধারকারী সংকেত ছাড়াই প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে খোলা সাগরে ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। যাত্রীদের অনেকেই সাঁতার জানতেন না এবং যাত্রাপথের একপর্যায়ে জিব্রাল্টার প্রণালীর মাঝখানে বোটটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে এটি ভাসতে থাকে।
তীব্র কুয়াশার কারণে সমুদ্রের দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। পুলিশ জানিয়েছে, সাত যাত্রীর কাছ থেকে ৮,০০০ ইউরো করে মোট ৫৬,০০০ ইউরো (প্রায় ৬৭ লাখ টাকা) হাতিয়ে নিয়েছিল এই পাচারকারী।
গ্রেপ্তারকৃত এই প্রধান সন্দেহভাজনকে বর্তমানে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিকদের অধিকার হরণ, মানবপাচারের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন এবং মানুষের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ উপকূলের পুলিশ এবং প্রসিকিউটরদের যৌথ সমন্বয়ে এই সফল অভিযান দুটি পরিচালিত হয়।
