বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যখন ইউরোপের বহু দেশ অভিবাসন ঠেকাতে সীমান্ত কড়াকড়ি, দেয়াল নির্মাণ ও ‘পুশব্যাক’ নীতিতে জোর দিচ্ছে, ঠিক তখনই স্পেন হাঁটছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। বাংলাদেশিসহ প্রায় ৫ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) স্পেন সরকার বামপন্থী পদেমোস দলের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছে এই ঘোষণা দেয়, যা ইউরোপীয় অভিবাসন রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে স্পেন সরকার ‘রাজকীয় ডিক্রি’ বা বিশেষ নির্বাহী আদেশ জারির পথ বেছে নিয়েছে। ফলে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরই দীর্ঘ সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই আইনটি কার্যকর হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু অভিবাসন নীতি পরিবর্তন নয়, বরং ইউরোপে একক দেশের নেওয়া সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক নিয়মিতকরণ উদ্যোগ।

যে কারণে সিদ্ধান্তটি নজিরবিহীন

একবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে এত বড় পরিসরে অভিবাসীদের বৈধতার সুযোগ আর কোনো দেশ দেয়নি। ইতালি, গ্রিস বা পর্তুগাল অতীতে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক নিয়মিতকরণ করলেও, স্পেনের এই ডিক্রি গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন এমনকি হাই-টেক স্টার্টআপ পর্যন্ত সব খাতের জন্য উন্মুক্ত।

২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসে লুইস রদ্রিগেস সাপাতেরোর নেতৃত্বে প্রায় ৬ লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, যা এতদিন ইউরোপে সবচেয়ে বড় নিয়মিতকরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমান উদ্যোগ সেই নজিরকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক মেরুকরণের এই সময়ে। যখন ফ্রান্স, ইতালি ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো অভিবাসনকে ‘নিরাপত্তা সংকট’ হিসেবে তুলে ধরছে, তখন স্পেন স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছে, যাদের এতদিন ‘অদৃশ্য শ্রমিক’ বলা হতো, তারাই দেশটির অর্থনীতির নীরব চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশিদের জন্য স্বস্তির বার্তা

স্পেনের বড় শহর বার্সেলোনা, মাদ্রিদ ও ভালেন্সিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি হাজারো পরিবারের জন্য এটি স্বস্তির বার্তা। বিভিন্ন প্রবাসী সংগঠনের হিসাবে, বর্তমানে স্পেনে ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্রের অভাবে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই ডিক্রির ফলে ১৫ থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশি সরাসরি বৈধতার আওতায় আসতে পারেন। পর্যটন, কৃষি, নির্মাণ, রেস্টুরেন্ট ও খুচরা ব্যবসায় কর্মরত এসব প্রবাসী এবার, বৈধ শ্রম চুক্তি করতে পারবেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা পাবেন, পুলিশের হয়রানি ছাড়াই চলাচল করতে পারবেন এবং নির্বিঘ্নে দেশে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাষায়,

“এই ডিক্রি আমাদের শুধু কাগজ দিচ্ছে না, মানুষ হিসেবে মর্যাদাও ফিরিয়ে দিচ্ছে”

মানবিক সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

স্পেন সরকারের এই পদক্ষেপের পেছনে শক্ত অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। কল্যাণ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে বিপুল শ্রমশক্তি প্রয়োজন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৫ লাখ অভিবাসীকে বৈধ করলে বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরো কর ও সামাজিক নিরাপত্তা অনুদান সরকারি কোষাগারে যুক্ত হবে। এতে পেনশন তহবিল শক্তিশালী হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় বাড়তি বিনিয়োগ সম্ভব হবে। বিশেষ করে,  নির্মাণ শিল্প, বয়স্কদের যত্ন ও সেবা খাত, এবং কৃষি ও পর্যটন খাতের শ্রম সংকট মোকাবিলায় এই নিয়মিতকরণ বড় ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা এসব খাতে আগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও পদেমোস দলের এই উদ্যোগকে অনেক বিশ্লেষক ‘রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখছেন। সংসদীয় ভোট এড়িয়ে রাজকীয় ডিক্রি জারির ফলে বিরোধী ডানপন্থী দলগুলোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে এটি স্পেনের বামপন্থী ভোটব্যাংককে শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিবাসী পরিবারগুলোর পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।

ইউরোপের জন্য বার্তা

এই ডিক্রি ইউরোপকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, অভিবাসন শুধু বোঝা নয়, সঠিক নীতিতে এটি অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। স্পেন দেখাতে চায়, অন্তর্ভুক্তি ও মানবিকতা একসঙ্গে চলতে পারে। বাংলাদেশিসহ লাখো অভিবাসীর জন্য এটি কেবল আইনি বৈধতা নয়, এটি একটি নতুন জীবনের দরজা। আর ইউরোপের জন্য, এটি হয়তো ভবিষ্যতের অভিবাসন নীতির এক সাহসী রূপরেখা।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version