রবিবার, ২৩শে আগস্ট, ২০২৬   |   ৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতার একটি মুসলিম কবরস্থানে ১৮ জন অজ্ঞাতপরিচয় অভিবাসীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে মরক্কো সীমান্ত দিয়ে সেউতায় প্রবেশের ঐতিহাসিক গণচেষ্টায় অন্তত ৯০ জনের মৃত্যু এবং ৭২,০০০ মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশের পর এই দাফন সম্পন্ন হলো।

দাফন করা ১৮ জন মরদেহের সবাই পুরুষ এবং তাদের কারোরই পরিচয় সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কবরস্থানের অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালক সাঈদ মোহাম্মদ বার্তা সংস্থা এপি-কে জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে যদি কোনো আত্মীয়স্বজন এসে পরিচয় দাবি করেন, তবে যেন খুঁজে পাওয়া যায়—সেজন্য কবরগুলোকে নামফলকের পরিবর্তে কেবল নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দাফন কাজের সময় একজন ইমাম জানাজার নামাজ ও দোয়া পরিচালনা করেন। এরপর কাফনসদৃশ সাদা ব্যাগে মোড়ানো মরদেহগুলোকে কবরে শায়িত করে মাটি চাপা দেওয়া হয়।
গত জুলাইয়ের শেষভাগে সেউতার সীমান্ত পার হওয়ার এই ঘটনাটিকে স্প্যানিশ সীমান্তের ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সীমান্ত চৌকির কাছে সমুদ্রের বাঁধ পার হওয়ার সময় পদদলিত হয়ে এবং পানিতে ডুবে এই মানুষগুলোর মৃত্যু হয়েছিল। আগামী দিনগুলোতে আরও বেশ কিছু মরদেহ দাফন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

এদিকে ‘মরক্কান অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটস’ সেউতায় এই বেনামী দাফন কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, নিহতদের পরিচয় সনাক্ত করার এবং তাদের মরদেহ মরক্কোয় (যেহেতু নিহতদের বড় অংশই মরক্কোর নাগরিক) ফেরত পাঠানোর সব ধরনের চেষ্টা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যেন দাফন বন্ধ রাখা হয়।
মানবাধিকার সংস্থাটি মরক্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘মরদেহগুলো যেন তাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়, যাতে স্বজনরা তাদের শেষ বিদায় অন্তত মর্যাদার সঙ্গে দিতে পারেন।’ এই বেনামী দাফনকে তারা একটি ‘নতুন মানবিক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা নিখোঁজ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিবারগুলোর কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সেউতার স্থানীয় সরকার দাবি করেছে, মরদেহগুলো মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া তারা সম্পন্ন করেছিল, কিন্তু মরক্কো সরকার এই মরদেহগুলো গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে মরক্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে গণমাধ্যমের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি এবং মরদেহ ফেরত নেওয়ার বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হচ্ছে কিনা, তাও স্পষ্ট করেনি।
সেউতায় এখনও হাজারো অভিবাসী
গত জুলাইয়ের শেষে সেউতায় প্রবেশ করা ৭২,০০০ মানুষের সিংহভাগই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মরক্কোয় ফিরে গিয়েছিল। তবে এখনও কয়েক হাজার অভিবাসী এই শহরে আটকা পড়ে আছেন, যা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য আবাসন ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় মানবিক সংকট তৈরি করেছে।


আটকে পড়া অভিবাসীদের সংখ্যার বিষয়ে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, নারী ও শিশুসহ প্রায় ১০,০০০ অভিবাসী এখনও সেউতায় থাকতে পারেন, তবে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের মতে এই সংখ্যা প্রায় ৫,০০০।
স্পেন এবং মরক্কো কর্তৃপক্ষ এই গণঅনুপ্রবেশের পেছনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব ও মানবপাচারকারী চক্রের কারসাজিকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে, অভিবাসীরা জানিয়েছেন—মরক্কোয় তীব্র বেকারত্ব, চরম দারিদ্র্য এবং কম বেতনের কারণেই তারা উন্নত জীবনের আশায় সীমান্ত পার হওয়ার এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক মক্কার কাবা শরিফের দিকে মুখ করে এই ১৮ জন প্রবাসীকে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। কবরের ওপর বসানো নম্বরযুক্ত পাথরগুলোই এখন তাদের একমাত্র পরিচয়, যা হয়তো কোনোদিন তাদের পরিবারের স্বজনদের প্রিয় মানুষের শেষ ঠিকানার সন্ধান দেবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version